আব্দুল্লাহ আল নোমান: বাংলাদেশ সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পণ্য ও সেবা খাত মিলিয়ে মোট ৬৩ দশমিক চার বিলিয়ন ডলারের একটি রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে পণ্য খাতের জন্য ৫৫ দশমিক দুই বিলিয়ন এবং সেবা খাতের জন্য আট দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত রপ্তানি অর্জনের তুলনায় এটি প্রায় পনেরো শতাংশের একটি বড় প্রবৃদ্ধি। বিগত অর্থবছরে দেশের মূল রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি, তীব্র জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থবিরতার পটভূমিতে এই লক্ষ্য অর্জন কতটা বাস্তবসম্মত, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বিবেচনা করলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বেশ কঠিন হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রপ্তানি পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ আটচল্লিশ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে শূন্য দশমিক পাঁচ আট শতাংশ কম। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া তৈরি পোশাক খাতে আয় এক দশমিক ছয় চার শতাংশ কমে আটত্রিশ দশমিক সত্তর বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এর আগের বছরগুলোতেও রপ্তানি আয়ে ধীরগতি ও স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। টানা মন্দার পর হঠাৎ করে পনেরো শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হলেও, বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও ব্যবসায়িক উদ্দীপনা অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে। তবে নিটওয়্যার প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ মনে করে, গ্যাস সংকটের কারণে গত কিছু দিন ধরে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দশ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই কঠিন, সেখানে বাস্তবসম্মত প্রবৃদ্ধি দুই থেকে চার শতাংশের বেশি হওয়া কঠিন। অবশ্য গত বছরের রপ্তানি আয় কম থাকায় এই বছরের কম ভিত্তির ওপর ভর করে একটি সাময়িক প্রবৃদ্ধি ঘটার সুযোগও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রপ্তানি খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান অভ্যন্তরীণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট ও শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে। সরকার গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিলেও এর সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর একটি নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তনে যে নীতিগত ধারাবাহিকতা তৈরি হচ্ছে, তা ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে কতটুকু কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে দ্রুত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর।
অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিও রপ্তানি খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের প্রধান দুটি রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার উঁচুতে থাকায় সাধারণ মানুষের কেনাকাটার সামর্থ্য ও প্রবণতায় ভাটা পড়েছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের গুদামে অবিক্রীত পোশাকের মজুত বেড়ে যাওয়ায় নতুন কার্যাদেশ দেওয়ার গতি শ্লথ হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত পরিবর্তন নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার নতুন দশ শতাংশ শুল্ক আরোপের মতো বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির রদবদল বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা অক্ষুণ্ন রাখা কঠিন করে তুলছে।
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সরকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং বাজার সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট দ্রুত স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে এবং জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিটি সংসদে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলমান রয়েছে এবং বছরের শেষ নাগাদ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তিগুলো বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করবে।
এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর সুপারিশ। বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, এই সময়সীমা বৃদ্ধি ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য সহযোগীদের জন্য বড় ধরণের স্বস্তি এনে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ আরও কয়েক বছর স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এই অতিরিক্ত সময়কাল ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করা সহজ হবে।
পরিশেষে বলা যায়, পনেরো শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাটি অর্জনে বড় ধরণের কৌশলগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। শিল্পে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা এবং পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্য বহুমুখী করার মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হলেও, সরকারের নীতিগত স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বিশ্ববাণিজ্যে কূটনৈতিক সফলতা নিশ্চিত করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও টেকসই রপ্তানি খাত গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
লেখক: উন্নয়ন বিশ্লেষক ; স্নাতক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
টিবিসি ডেস্ক ।। 












