আব্দুল্লাহ আল নোমান: একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কোনো দেশের সবচেয়ে বড় মূলধন তার দক্ষ মানবসম্পদ। বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে আধুনিক পৃথিবীর উপযোগী করে গড়ে তুলতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। সম্প্রতি মাধ্যমিক শিক্ষার যে ভয়াবহ চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা কেবল হতাশাজনক নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রার জন্য এক বড় অশনিসংকেত। যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শ্রেণিকক্ষে কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তবমুখী শিক্ষার কথা বলছি, তখন সরকারি স্কুলগুলো শিক্ষক ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের তীব্র সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক, অথচ সরকারি স্কুলগুলোতে এই মুহূর্তে দুই হাজার আটশ বিয়াল্লিশটি শিক্ষকের পদ শূন্য। প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের সংকট আরও প্রকট; তিনশ তিরাশিটি প্রধান শিক্ষক এবং দুইশ ঊনপঞ্চাশটি সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। এই প্রশাসনিক শূন্যতায় মাঠ পর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গড় অনুপাত ১:৩৭, যা সরকারের নিজস্ব মানদণ্ড ১:৩০-এর চেয়ে অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে এই অনুপাত ১:৫০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে যে মানবিক সংযোগ ও শিক্ষার্থীর মেধা মূল্যায়নের সুযোগ থাকার কথা, তা হারিয়ে যাচ্ছে। একজন শিক্ষক একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে গিয়ে কেবল ক্লান্ত ও বিপর্যস্তই হচ্ছেন না, বরং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই এখানে ব্যাহত হচ্ছে।
এই সংকট মাউশির প্রশাসনিক স্তরেও ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে শুরু করে সদর দপ্তরের উপ-পরিচালক পদসহ স্কুল পরিদর্শকের সব কটি পদই আজ ভারপ্রাপ্ত বা শূন্য। এমন ফাঁপা প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন কখনোই সফল হতে পারে না। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’, ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ শেখানোর মতো পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও আইসিটি বা কারিগরি প্রশিক্ষকের অভাবে তা আজ শৌখিন আসবাবে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করা হলেও, ভেতরে দক্ষ জনবল নিশ্চিত না করে ভবন নির্মাণ এক ধরনের বিলাসিতা ও চরম পরিহাস।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অচল অবস্থা একটি গভীর আর্থ-সামাজিক বৈষম্য তৈরি করছে। সম্পদশালী পরিবারের সন্তানেরা ইংরেজি মাধ্যম বা নামি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে, অথচ সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই ভেঙে পড়া ব্যবস্থার মারপ্যাঁচে পড়ে এক ধরনের অদক্ষ বেকার বাহিনীতে পরিণত হচ্ছে। এই ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ বা সুযোগের অসমতা ভবিষ্যতে সমাজকে এক বড় ধরনের দ্বিমুখী বিভাজনের দিকে ঠেলে দেবে।
এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়ার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পিএসসির মন্থর গতি। সরকারি শিক্ষা ক্যাডার ও নন-ক্যাডার জটিলতা নিরসনে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী ‘শিক্ষা কমিশন’ গঠনের বিতর্ক আজ সময়ের দাবি। শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো ও দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ না রাখলে মেধাবীরা এ পেশায় আগ্রহী হবেন না। দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যের মতো অনৈতিক চর্চা বন্ধ করে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য।
বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কেবল টাকা ঢেলে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। অবিলম্বে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সরকারি মাধ্যমিকের সমস্ত শূন্য পদ পূরণ করতে হবে। মাঠ পর্যায়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্কুল পরিদর্শকদের নিয়োগ ও মাউশির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্থায়ী করা জরুরি। অবকাঠামোর মোহ ত্যাগ করে সরকারকে এখন মানুষ ও দক্ষতায় বিনিয়োগ করতে হবে।
একটি জাতির মেরুদণ্ড যদি দুর্বল ও ক্ষয়ে যাওয়া হয়, তবে সেই জাতি কখনোই বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। আমরা আশা করি, সরকার এই দৃশ্যমান সংকট নিরসনে অবিলম্বে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে। অন্যথায়, আমাদের এই বিশাল তরুণ প্রজন্ম ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড না হয়ে দেশের জন্য এক চরম জনমিতিক বিপর্যয়ে পরিণত হবে।
লেখক: উন্নয়ন বিশ্লেষক ; স্নাতক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
আব্দুল্লাহ আল নোমান 












