ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: ত্রিশালকে ‘কবি নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সাম্প্রতিক যে ঘোষণা, তা কেবল কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা কবির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়; এটি বাঙালির তথা বাংলা সাহিত্যের আত্মপরিচয় ও মননশীলতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক বিশাল সুযোগ। নজরুল আমাদের দ্রোহ ও প্রেমের ধ্রুবতারা, কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাঙালির সাংস্কৃতিক মহাকাশ কেবল একটি নক্ষত্রে আলোকিত নয়। আমাদের সাহিত্যিক, শিল্পী এবং লোকায়ত ধারার যে বিশাল পরম্পরা, তাঁদের সম্মিলিত আলোতেই আমাদের মনন আজ ঋদ্ধ। তাই প্রস্তাবিত নতুন থিম সিটির অন্যতম দর্শন হওয়া উচিত এমন এক পরিসর তৈরি করা, যা কেবল কবির স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং হয়ে উঠবে বাংলা সাহিত্যের সকল কালজয়ী প্রজ্ঞাবান, শিল্পী ও লোকমানসের পুনর্জন্মের এক আধুনিক কেন্দ্র।
আমাদের ময়মনসিংহের মাটি ও জলবায়ু বরাবরই সাহিত্যের উর্বর ক্ষেত্র। এখানকার আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন অসংখ্য প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ। মৈমনসিংহের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে লোকসংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে-এর নাম, যিনি আমাদের লোকগাঁথাকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতীর সেই করুণ ও অমর সুর আজও আমাদের এই জনপদের বাতাসে মিশে আছে। ইতিহাসের গভীরতা সন্ধানে কেদারনাথ মজুমদারের গবেষণাকর্ম আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক। সৃজনশীলতার জগতে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী কিংবা সুকুমার রায়ের বর্ণাঢ্য সৃজনশীলতা আজও আমাদের পথ দেখায়। এছাড়া আনন্দমোহন বসুর মতো বরেণ্য মানুষের সমাজসেবামূলক দর্শন ও আধুনিক শিক্ষাভাবনা আমাদের এই জনপদের ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়; এই জনপদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আরও গভীর। খোদ ত্রিশালের মাটি ধন্য হয়েছে আবুল মনসুর আহমদ ও আবুল কালাম শামছুদ্দিনের মতো ব্যক্তিত্বের পদচারণায়, যাদের উভয়ের জীবনেই রয়েছে সুবিস্তৃত নজরুল অধ্যায়।
আমাদের শিল্প-সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরে জসিমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশ, মোতাহার হোসেন চৌধুরী কিংবা জয়নুল আবেদীনের মতো নক্ষত্রেরা স্বনামে ভাস্বর। এই নক্ষত্রদের কথা আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। সময়ের আবর্তে তাঁদের অনেকেই আজ আমাদের চর্চার মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে সরে গেছেন। অথচ বাংলা সাহিত্যের প্রাণ বাঁচাতে মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো অগ্রজদের পাশাপাশি সৈয়দ মুজতবা আলী, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কিংবা হুমায়ুন কবিরের মতো বহুমুখী প্রতিভাদের চর্চা করা অনিবার্য। পাশাপাশি, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ কিংবা শহীদ কাদরীর মতো আধুনিক ও সমকালীন শক্তিশালী কণ্ঠস্বরই বা ভুলে যাই কী করে? তাই, নজরুল সিটি হোক সেই অভিন্ন ভূমি, যেখানে নজরুলের গবেষণার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের এই মহীরুহদের নিয়ে নিয়মিত বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান চলবে।
এই নজরুল সিটিতে স্থাপিত হতে পারে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’র আদলে একটি স্বতন্ত্র গবেষণাকেন্দ্র। এটি কেবল একটি আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা হবে না, বরং হয়ে উঠবে জীবনবোধ ও শিল্পচর্চার প্রাণকেন্দ্র। নজরুল এখানে হবেন এক বিশাল উদার আকাশ; যে আকাশে আশ্রয় নিয়ে বাংলা সাহিত্যের অপরাপর নক্ষত্ররা নিজেদের মহিমায় বেঁচে থাকবেন চিরকাল। নজরুলের নামেই হোক তাঁদের সম্মিলিত পুনর্জন্ম; এক শাশ্বত ও বৈভবপূর্ণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার!
আমরা চাই, এখানে নজরুলের ‘লেটোর দল’ থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার লোকায়ত বাউল সাধনা এবং লোকগানের চর্চাকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হোক। পথনাট্যের যে প্রাণবন্ত ধারা, তা এক সুনির্দিষ্ট স্থান প্রদানের মাধ্যমে, আমরা আমাদের শেকড়ের সাথে আধুনিক মঞ্চনাটকের এক সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারি। লৌকিক ও অলৌকিক সব ধারার মিলনমেলায় পরিণত হোক এই শহর। বাউলদের অদ্বৈতবাদী দর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক নগর জীবনের জটিল মনস্তত্ত্ব, সবকিছুরই বিশ্লেষণ হবে এখানে।
মাইকেলের সনেট, রবীন্দ্রনাথের মানবিকতা, জীবনানন্দের বনলতা সেন, জসিমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ, সবকিছুই যেন এখানে জীবন্ত হয়ে ওঠে। জয়নুল আবেদীনের তুলির আঁচড় কিংবা লোকজ শিল্পী ও বাউলদের সুরের মূর্ছনা এই শহরকে দেবে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখানে নজরুল গবেষণার পাশাপাশি বেগম রোকেয়া, কামিনী রায়, তারাশঙ্কর, শরদিন্দু, বিভূতিভূষণ কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দিকপালদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে নিয়মিত সেমিনার ও ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হবে। এমনকি সমকালীন সাহিত্যিকদের সৃজনশীল কাজগুলোকেও এই শহরে আশ্রয় দিতে হবে, যেন এটি কেবল ইতিহাস চর্চার স্থান না হয়ে ওঠে, বরং সৃজনশীলতার একটি চলমান কারখানা হিসেবে কাজ করে। এই কারখানা থেকে যেন বেরিয়ে আসে নতুন প্রজন্মের লেখক, শিল্পী ও চিন্তক।
প্রস্তাবিত কবি নজরুল সিটি হোক গণতন্ত্র, সাম্য ও সৃজনশীলতার একটি জীবন্ত পরীক্ষাগার। কবি যেমন সাম্যের গান গেয়েছেন, এই শহরও তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক উদারতার চর্চাকেন্দ্র হয়ে উঠবে। এখানে রাজনীতি হবে উন্নয়নের জন্য, গণতন্ত্র হবে মানুষের মত প্রকাশের জন্য এবং সাম্য হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকাশের জন্য। এটি হবে এমন এক স্থান যেখানে আমাদের শেকড় থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও বৈশ্বিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠ নির্যাস মিশে একাকার হবে।
প্রযুক্তির আধুনিকতা এই শহরের প্রতিটি ইট ও স্থাপত্যে থাকবে, কিন্তু তার প্রাণ হবে আমাদের দেশীয় দর্শন ও লোকায়ত সংস্কৃতি। আমরা যদি ইউরোপের ইউনিভার্সিটি টাউনগুলোর দিকে তাকাই, দেখব কীভাবে একটি শহর তার জ্ঞানচর্চা দিয়ে গোটা পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেয়। প্রস্তাবিত কবি নজরুল সিটিও ঠিক তেমনি একটি কেন্দ্র হয়ে উঠুক, যেখানে ডানপন্থা থেকে শুরু করে প্রথাবিরোধী লেখক, সবারই একটি নির্দিষ্ট স্থান থাকবে।
ত্রিশালের সন্তান হিসেবে আমার স্বপ্ন, নজরুল সিটি যেন কেবল দাপ্তরিক পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। এটি হোক এমন এক শহর, যা আমাদের ইতিহাসকে সম্মান জানাবে, সমকালীন মেধাকে লালন করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার হয়ে থাকবে। নজরুলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শহরই আমাদের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অমরত্বের নতুন ঠিকানা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। এটিই হোক আমাদের সম্মিলিত অভীষ্ট।
নজরুলের সাম্যবাদী চেতনায় অনুপ্রাণিত এই শহরটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকুক, যেখানে বাউল থেকে বুদ্ধিজীবী, সবাই খুঁজে পাবে তাদের নিজ নিজ সৃজনশীলতার আলো। আমরা চাই, এই শহর যেন কেবল কবির শহর না হয়ে ওঠে; এটি হয়ে উঠুক বাঙালির সেই শাশ্বত চেতনার শহর, যা আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে ধারণ করে আগামী শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে যাবে।
লেখক: নগর পরিকল্পনাবিদ; সদস্য সচিব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স, ময়মনসিংহ জেলা কমিটি।
ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল 












