০৭:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দ্রোহ-সাম্যের ত্রিশালে ‘নজরুল সিটি’: স্বপ্ন এখন বাস্তব

লেখক: ইয়াসির আরাফাত, সভাপতি, ত্রিশাল উপজেলা ছাত্রদল

ইয়াসির আরাফাত: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের কাছে কোনো দূর আকাশের নিস্পৃহ নক্ষত্র নন; তিনি আমাদের প্রতিটি লড়াইয়ের, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের এবং প্রতিটি বিজয়ের অবিনশ্বর সঙ্গী। বিশেষ করে যারা আমরা ময়মনসিংহের এই ঐতিহাসিক ত্রিশালের মাটিতে বড় হয়েছি, আমাদের নিঃশ্বাস, ধূলিকণা আর বাতাসে নজরুলের উপলব্ধি মিশে আছেন। শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, যখন স্কুল ফাঁকি দিয়ে নজরুল জয়ন্তীর মেলায় ছুটে যেতাম। আমাদের কাছে নজরুল জয়ন্তী কেবল পঞ্জিকার কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস ছিল না, তা ছিল প্রাণের উৎসব, আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় আনন্দমেলা। কৈশোরে জয়ন্তী থেকে কেনা নজরুলের বই আর তাঁর চির-উন্নত শিরের গল্পগুলো অবচেতনভাবেই আমাদের মনের ভেতর এক লড়াকু চেতনার বীজ বুনে দিয়েছিল।

পরবর্তীতে যখন ছাত্ররাজনীতির ময়দানে পা রেখেছি, রাজপথে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের মিছিলে দাঁড়িয়েছি, তখনও বুক পকেটে প্রেরণা হয়ে ছিলেন নজরুল। বিগত ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে যখন মুক্তকণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক বিভীষিকাময় রাজত্ব কায়েম ছিল, যখন আমাদের ওপর নেমে এসেছে অবর্ণনীয় জেল-জুলুম, হুলিয়া আর লাঠি-টিয়ারগ্যাস, পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, যখন মনে হচ্ছিল চারপাশটা ঘোর অমাবস্যায় ঢাকা, ঠিক তখনই নজরুলের কবিতা আমাদের বুকে নতুন করে বেঁচে থাকার, লড়ে যাওয়ার জ্বালানি জুগিয়েছে।

‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’ কিংবা ‘বলো বীর, বলো উন্নত মম শির’, এই পঙক্তিগুলো আমাদের মননে ও মস্তিস্কে আক্ষরিক অর্থেই আগুন জ্বালিয়েছে। কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বসেও যে মানুষটা গেয়ে ওঠেন সাম্যের গান, তাঁর আদর্শকে ধারণ করেই আমরা রাজপথের লড়াইয়ে নিজেদের সঁপে দিয়েছি। তাই নজরুল আমাদের কাছে শুধু একজন কবি নন, তিনি আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের দ্রোহ ও টিকে থাকার চিরন্তন অক্সিজেন।

সম্প্রতি জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত আমাদের প্রাণের শহর ত্রিশালকে কেন্দ্র করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে আন্তর্জাতিক মানের ‘নজরুল সিটি’ বা থিম শহর প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছেন এবং ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছেন, তাতে ত্রিশালের সন্তান এবং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার আনন্দের সীমা নেই। প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমরা ত্রিশালবাসী কৃতজ্ঞ। এই ঘোষণা আমাদের বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ে লালিত একটি স্বপ্নের সার্থক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর। টেলিভিশনের পর্দায় যখন এই ঘোষণার খবরটি আসছিল, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল কাজির শিমলার দারোগা বাড়ি, সুতিয়া নদীর অববাহিকা আর আমাদের চিরচেনা সেই অবিন্যস্ত ত্রিশাল, যা এখন এক নতুন গ্লোবাল আইডেন্টিটি পাওয়ার অপেক্ষায়।

ত্রিশালের মাটিতে নজরুল চর্চার এই যে বিশাল ক্যানভাস, এর ঐতিহাসিক গোড়াপত্তন হয়েছিল বিএনপির আমলেই। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিগত দিনে সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ত্রিশালবাসীকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঐতিহাসিক নজরুল মঞ্চ এবং আধুনিক ডাকবাংলো উপহার দিয়ে এ অঞ্চলে নজরুলীয় সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন।

দেশনেত্রীর সেই অনন্য অবদানকে হৃদয়ে ধারণ করে, আজকের দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী ভিশন অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন আমাদের ত্রিশালের গণমানুষের নেতা, জননন্দিত সংসদ সদস্য ডাঃ মাহবুবুর রহমান লিটন। ত্রিশালে আন্তর্জাতিক মানের থিম সিটি বা ‘নজরুল সিটি’ প্রতিষ্ঠার প্রথম লিখিত প্রস্তাব ও দাবিটি আমাদের প্রিয় নেতার পক্ষ থেকেই প্রথম উত্থাপন করা হয়েছিল। এই মেগা প্রকল্পের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা ও মূল প্রস্তাবক তিনি। মাননীয় সাংসদ লিটন ভাইয়ের আন্তরিক আপ্যায়ন ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঐতিহাসিক নির্দেশনার মাধ্যমে ত্রিশালবাসীকে ধন্য করেছেন। গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে স্থানীয় সাংসদের এই নিরলস উদ্যোগ, সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা এবং শক্তিশালী ভূমিকা আমাদের মতো মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মীদের এবং সাধারণ ত্রিশালবাসীকে প্রতিনিয়ত উজ্জীবিত করছে। এ জন্য আমাদের প্রিয় নেতার প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সমন্বিত। ‘নজরুল সিটি’র কারিগরি, স্থানিক পরিকল্পনা ও স্থাপত্যের নিখুঁত দিকগুলো দেখার জন্য আমাদের দেশে অত্যন্ত যোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার মানুষেরা আছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) -এর দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদগণ এবং ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি) -এর দূরদর্শী স্থপতিবৃন্দই এই শহরের বৈজ্ঞানিক, তাত্ত্বিক ও স্থানিক অবয়ব ফুটিয়ে তুলবেন। তাঁরাই নিশ্চিত করবেন কীভাবে নতুন আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগে পরিবেশ ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এক অনন্য রূপ পাবে আমাদের ত্রিশাল। কোন জায়গায় ‘কোর জোন’ হবে, কোথায় ‘হেরিটেজ জোন’ হবে, কিংবা কীভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের তীব্র ট্রাফিক চাপ সামলে একটি সমন্বিত পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে, এইসব জটিল ও টেকনিক্যাল নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব থাকবে আমাদের এই বিশেষজ্ঞ স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদদের ওপরেই।

কিন্তু আমরা, যারা রাজপথের কর্মী, যারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, আমরা এই শহরটিকে দেখব সম্পূর্ণ আবেগের জায়গা থেকে, হৃদয়ের গভীর থেকে। আমাদের আবেগ বলে, এই ‘নজরুল সিটি’ যেন কেবল ইট-পাথর-কংক্রিটের আর দশটা প্রথাগত বাণিজ্যিক বা আবাসিক শহরের মতো নিষ্প্রাণ জ্যামিতিক নকশা না হয়। এটি যেন হয় নজরুলের সাম্যবাদ, মানবতা ও সমঅধিকারের এক জীবন্ত দলিল।

নজরুলের দর্শনের মূল সুরই ছিল শোষিতের অধিকার প্রতিষ্ঠা; তাই তাঁর স্মৃতির এই শহরে যেন কোনো দরিদ্র মানুষকে ভূমি অধিগ্রহণের নামে তার চিরচেনা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে সর্বস্বান্ত হতে না হয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, নীতি-নির্ধারক ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা এমন মডেল নিয়ে আসবেন যা স্থানীয় মানুষের অংশীদারিত্ব ও অর্থনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত করবে।

আমরা এমন এক স্বপ্নের ‘নজরুল সিটি’ চাই, যার অলিগলিতে হাঁটলে মনে হবে আমরা নজরুলের সাহিত্যের ভেতরেই বিচরণ করছি। আমাদের কল্পনার শহরে ফুটপাতে পা রাখলে টেরাকোটার ইটে খোদাই করা কবির গানের স্বরলিপি আমাদের ঐতিহ্যের কথা মনে করাবে। আধুনিক দৃষ্টিকটু সোডিয়াম লাইটের পরিবর্তে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ভেসে উঠবে কবির ‘ধূমকেতু’ আর ‘চাঁদ’-এর নান্দনিক থিম। সুতিয়া নদীর বুক চিরে যখন ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব নৌকা বা শাটল বাস চলবে, তখন তার কলতানে আর দু’পাশের গাছপালার মর্মরে প্রতিধ্বনিত হবে সম্প্রীতি ও মিলনের গান।

পরিকল্পনাবিদ আর স্থপতিদের দূরদর্শিতা, আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং আমাদের কোটি প্রাণের আবেগ, এই তিনের মহামিলনেই ত্রিশাল বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ‘নজরুল সিটি’ কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি নতুন বিন্দুর সংযোজন হবে না, এটি হবে বিশ্ব দরবারে টেকসই, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনার এক অনন্য ধ্রুবতারা।

নজরুলের স্মৃতিধন্য এই পবিত্র মাটিকে বিশ্ব দরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এই মহোত্তম যাত্রায় আমরা রাজপথের লড়াকু সৈনিকেরা আমাদের সমস্ত আবেগ, ভালোবাসা, মেধা ও শ্রম দিয়ে পাশে থাকতে প্রস্তুত। জয় হোক নজরুলের, জয় হোক সাম্যের। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

লেখক: সভাপতি, ত্রিশাল উপজেলা ছাত্রদল। 

দ্রোহ-সাম্যের ত্রিশালে ‘নজরুল সিটি’: স্বপ্ন এখন বাস্তব

প্রকাশ: ১০:৪৭:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

ইয়াসির আরাফাত: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের কাছে কোনো দূর আকাশের নিস্পৃহ নক্ষত্র নন; তিনি আমাদের প্রতিটি লড়াইয়ের, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের এবং প্রতিটি বিজয়ের অবিনশ্বর সঙ্গী। বিশেষ করে যারা আমরা ময়মনসিংহের এই ঐতিহাসিক ত্রিশালের মাটিতে বড় হয়েছি, আমাদের নিঃশ্বাস, ধূলিকণা আর বাতাসে নজরুলের উপলব্ধি মিশে আছেন। শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, যখন স্কুল ফাঁকি দিয়ে নজরুল জয়ন্তীর মেলায় ছুটে যেতাম। আমাদের কাছে নজরুল জয়ন্তী কেবল পঞ্জিকার কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস ছিল না, তা ছিল প্রাণের উৎসব, আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় আনন্দমেলা। কৈশোরে জয়ন্তী থেকে কেনা নজরুলের বই আর তাঁর চির-উন্নত শিরের গল্পগুলো অবচেতনভাবেই আমাদের মনের ভেতর এক লড়াকু চেতনার বীজ বুনে দিয়েছিল।

পরবর্তীতে যখন ছাত্ররাজনীতির ময়দানে পা রেখেছি, রাজপথে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের মিছিলে দাঁড়িয়েছি, তখনও বুক পকেটে প্রেরণা হয়ে ছিলেন নজরুল। বিগত ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে যখন মুক্তকণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক বিভীষিকাময় রাজত্ব কায়েম ছিল, যখন আমাদের ওপর নেমে এসেছে অবর্ণনীয় জেল-জুলুম, হুলিয়া আর লাঠি-টিয়ারগ্যাস, পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, যখন মনে হচ্ছিল চারপাশটা ঘোর অমাবস্যায় ঢাকা, ঠিক তখনই নজরুলের কবিতা আমাদের বুকে নতুন করে বেঁচে থাকার, লড়ে যাওয়ার জ্বালানি জুগিয়েছে।

‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’ কিংবা ‘বলো বীর, বলো উন্নত মম শির’, এই পঙক্তিগুলো আমাদের মননে ও মস্তিস্কে আক্ষরিক অর্থেই আগুন জ্বালিয়েছে। কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বসেও যে মানুষটা গেয়ে ওঠেন সাম্যের গান, তাঁর আদর্শকে ধারণ করেই আমরা রাজপথের লড়াইয়ে নিজেদের সঁপে দিয়েছি। তাই নজরুল আমাদের কাছে শুধু একজন কবি নন, তিনি আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের দ্রোহ ও টিকে থাকার চিরন্তন অক্সিজেন।

সম্প্রতি জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত আমাদের প্রাণের শহর ত্রিশালকে কেন্দ্র করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে আন্তর্জাতিক মানের ‘নজরুল সিটি’ বা থিম শহর প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছেন এবং ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছেন, তাতে ত্রিশালের সন্তান এবং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার আনন্দের সীমা নেই। প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমরা ত্রিশালবাসী কৃতজ্ঞ। এই ঘোষণা আমাদের বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ে লালিত একটি স্বপ্নের সার্থক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর। টেলিভিশনের পর্দায় যখন এই ঘোষণার খবরটি আসছিল, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল কাজির শিমলার দারোগা বাড়ি, সুতিয়া নদীর অববাহিকা আর আমাদের চিরচেনা সেই অবিন্যস্ত ত্রিশাল, যা এখন এক নতুন গ্লোবাল আইডেন্টিটি পাওয়ার অপেক্ষায়।

ত্রিশালের মাটিতে নজরুল চর্চার এই যে বিশাল ক্যানভাস, এর ঐতিহাসিক গোড়াপত্তন হয়েছিল বিএনপির আমলেই। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিগত দিনে সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ত্রিশালবাসীকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঐতিহাসিক নজরুল মঞ্চ এবং আধুনিক ডাকবাংলো উপহার দিয়ে এ অঞ্চলে নজরুলীয় সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন।

দেশনেত্রীর সেই অনন্য অবদানকে হৃদয়ে ধারণ করে, আজকের দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী ভিশন অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন আমাদের ত্রিশালের গণমানুষের নেতা, জননন্দিত সংসদ সদস্য ডাঃ মাহবুবুর রহমান লিটন। ত্রিশালে আন্তর্জাতিক মানের থিম সিটি বা ‘নজরুল সিটি’ প্রতিষ্ঠার প্রথম লিখিত প্রস্তাব ও দাবিটি আমাদের প্রিয় নেতার পক্ষ থেকেই প্রথম উত্থাপন করা হয়েছিল। এই মেগা প্রকল্পের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা ও মূল প্রস্তাবক তিনি। মাননীয় সাংসদ লিটন ভাইয়ের আন্তরিক আপ্যায়ন ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঐতিহাসিক নির্দেশনার মাধ্যমে ত্রিশালবাসীকে ধন্য করেছেন। গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে স্থানীয় সাংসদের এই নিরলস উদ্যোগ, সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা এবং শক্তিশালী ভূমিকা আমাদের মতো মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মীদের এবং সাধারণ ত্রিশালবাসীকে প্রতিনিয়ত উজ্জীবিত করছে। এ জন্য আমাদের প্রিয় নেতার প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সমন্বিত। ‘নজরুল সিটি’র কারিগরি, স্থানিক পরিকল্পনা ও স্থাপত্যের নিখুঁত দিকগুলো দেখার জন্য আমাদের দেশে অত্যন্ত যোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার মানুষেরা আছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) -এর দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদগণ এবং ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি) -এর দূরদর্শী স্থপতিবৃন্দই এই শহরের বৈজ্ঞানিক, তাত্ত্বিক ও স্থানিক অবয়ব ফুটিয়ে তুলবেন। তাঁরাই নিশ্চিত করবেন কীভাবে নতুন আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগে পরিবেশ ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এক অনন্য রূপ পাবে আমাদের ত্রিশাল। কোন জায়গায় ‘কোর জোন’ হবে, কোথায় ‘হেরিটেজ জোন’ হবে, কিংবা কীভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের তীব্র ট্রাফিক চাপ সামলে একটি সমন্বিত পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে, এইসব জটিল ও টেকনিক্যাল নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব থাকবে আমাদের এই বিশেষজ্ঞ স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদদের ওপরেই।

কিন্তু আমরা, যারা রাজপথের কর্মী, যারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, আমরা এই শহরটিকে দেখব সম্পূর্ণ আবেগের জায়গা থেকে, হৃদয়ের গভীর থেকে। আমাদের আবেগ বলে, এই ‘নজরুল সিটি’ যেন কেবল ইট-পাথর-কংক্রিটের আর দশটা প্রথাগত বাণিজ্যিক বা আবাসিক শহরের মতো নিষ্প্রাণ জ্যামিতিক নকশা না হয়। এটি যেন হয় নজরুলের সাম্যবাদ, মানবতা ও সমঅধিকারের এক জীবন্ত দলিল।

নজরুলের দর্শনের মূল সুরই ছিল শোষিতের অধিকার প্রতিষ্ঠা; তাই তাঁর স্মৃতির এই শহরে যেন কোনো দরিদ্র মানুষকে ভূমি অধিগ্রহণের নামে তার চিরচেনা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে সর্বস্বান্ত হতে না হয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, নীতি-নির্ধারক ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা এমন মডেল নিয়ে আসবেন যা স্থানীয় মানুষের অংশীদারিত্ব ও অর্থনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত করবে।

আমরা এমন এক স্বপ্নের ‘নজরুল সিটি’ চাই, যার অলিগলিতে হাঁটলে মনে হবে আমরা নজরুলের সাহিত্যের ভেতরেই বিচরণ করছি। আমাদের কল্পনার শহরে ফুটপাতে পা রাখলে টেরাকোটার ইটে খোদাই করা কবির গানের স্বরলিপি আমাদের ঐতিহ্যের কথা মনে করাবে। আধুনিক দৃষ্টিকটু সোডিয়াম লাইটের পরিবর্তে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ভেসে উঠবে কবির ‘ধূমকেতু’ আর ‘চাঁদ’-এর নান্দনিক থিম। সুতিয়া নদীর বুক চিরে যখন ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব নৌকা বা শাটল বাস চলবে, তখন তার কলতানে আর দু’পাশের গাছপালার মর্মরে প্রতিধ্বনিত হবে সম্প্রীতি ও মিলনের গান।

পরিকল্পনাবিদ আর স্থপতিদের দূরদর্শিতা, আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং আমাদের কোটি প্রাণের আবেগ, এই তিনের মহামিলনেই ত্রিশাল বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ‘নজরুল সিটি’ কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি নতুন বিন্দুর সংযোজন হবে না, এটি হবে বিশ্ব দরবারে টেকসই, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনার এক অনন্য ধ্রুবতারা।

নজরুলের স্মৃতিধন্য এই পবিত্র মাটিকে বিশ্ব দরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এই মহোত্তম যাত্রায় আমরা রাজপথের লড়াকু সৈনিকেরা আমাদের সমস্ত আবেগ, ভালোবাসা, মেধা ও শ্রম দিয়ে পাশে থাকতে প্রস্তুত। জয় হোক নজরুলের, জয় হোক সাম্যের। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

লেখক: সভাপতি, ত্রিশাল উপজেলা ছাত্রদল।