০৮:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্থির জ্বালানি বাজার: টেকসই রূপান্তরের পথ

ছবি: সংগৃহীত

মোঃ মাইনুদ্দিন হাওলাদার (মইন): জ্বালানি সংকটের ঘূর্ণাবর্ত এবং সবুজ রূপান্তর, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এক অনিবার্য পঠনপাঠন। আপনার এই চমৎকার ও বিশ্লেষণসমৃদ্ধ লেখাটিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় বা উপ-সম্পাদকীয় পাতার উপযোগিতা ও গদ্যপ্রবাহে ঢেলে সাজানো হলো। পত্রিকার পাতার প্রাতিষ্ঠানিক ও মননশীল টোন বজায় রেখে এতে ভেতরের কোনো উপশিরোনাম রাখা হয়নি, বরং অনুচ্ছেদের স্বাভাবিক প্রবাহ ও যুক্তির ধারাবাহিকতায় পুরো বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

গত মার্চ মাসের শুরুতে ঢাকার পেট্রলপাম্পগুলোর সামনে ডেলিভারি রাইডার ও অফিসযাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আমাদের জ্বালানি খাতের ভঙ্গুর বাস্তবতাকে নতুন করে চোখের আঙুলে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল। মোটরসাইকেলের জন্য দুই লিটার আর ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য দশ লিটার জ্বালানির রেশনিং সেই দিনগুলোতে অনেকেরই জীবনযাত্রা থমকে দিয়েছিল। অথচ এই সংকটের উৎস ঢাকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালিতে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই কৌশলগত এই প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং এলএনজির প্রায় সমপরিমাণ অংশ এই পথ দিয়েই সরবরাহ হতো। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাসকয়েক পেরিয়ে গেলেও জাহাজ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের হিসাব বলছে, হরমুজ দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো অনেক নিচে। অর্থাৎ, বৈশ্বিক জ্বালানির এই মহাসড়কে ঝড়ের শঙ্কা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি।

এই ভূরাজনৈতিক উত্তাপের আঁচ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশে আলাদাভাবে লেগেছে, যার বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে গ্যাসে। দেশের এলএনজির সিংহভাগই কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর পর দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীরা ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় এবং পরবর্তীতে ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে রিগ্যাসিফিকেশন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমে আসায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে তীব্র ধাক্কা লাগে। গ্রীষ্মের সেই দিনগুলোতে লোডশেডিং এক হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল দেড় হাজারের বেশি টেক্সটাইল মিল ও কলকারখানায়। অথচ ভারতের চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত থাকলেও ধাক্কাটা আসে রান্নার গ্যাসে। প্রয়োজনীয় এলপিজির প্রায় পুরোটাই হরমুজ হয়ে আসায় এবং মজুত অপ্রতুল থাকায় ভারতের সাধারণ পরিবারগুলোকে সরাসরি এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানে পেট্রলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির পারদ চড়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই আঞ্চলিক জ্বালানি বিঘ্নের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা শ্রীলঙ্কার মতো সংকটকবলিত দেশের অর্থনীতিকে আরও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

সংকটের এই দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল আতঙ্ক এবং আস্থার সংকট মোকাবিলা করা। বাংলাদেশে ডিজেলের বিক্রি হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ঘাটতির ভয়। কিন্তু কেবল নিষেধাজ্ঞা বা রেশনিং দিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন তথ্যগত স্বচ্ছতা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও দেশীয় বিশ্লেষকদের মতে, দেশের জ্বালানির মজুত ঠিক কত দিনের এবং পরবর্তী চালানগুলো কবে এসে পৌঁছাবে, এই তথ্যগুলো নিয়মিত প্রকাশ করলে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা ও অযৌক্তিক লাইন অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হতো। একই সঙ্গে ভর্তুকির প্রচলিত সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। সবাইকে এক ছাতার নিচে ভর্তুকি দিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়, তা টেকসই হতে পারে না। এর পরিবর্তে নিম্নআয়ের পরিবার কিংবা কৃষি খাতের সেচের মতো অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিলে সীমিত রিসোর্সে অনেক বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব। তাছাড়া আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ বা বিকল্প শোধনাগারের ওপর সাময়িক ভরসা করা গেলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

তবে আশার আলো দেখা যাচ্ছে জ্বালানি রূপান্তরের অন্য একটি দিগন্তে, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ প্রতিবেশী পাকিস্তানের ছাদের সৌরবিদ্যুৎ বিপ্লব। দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌর প্যানেলের নজিরবিহীন আমদানির ফলে কোটি কোটি ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে এবং সংকটকালেও বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বিরাট ভূমিকা রেখেছে। এই রূপান্তরটি কোনো একক সরকারি মেগা প্রকল্পের ফসল নয়, বরং আমদানিতে সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং সাশ্রয়ী মূল্যের চীনা প্যানেলের সুবাদে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা স্বউদ্যোগে এই পরিবর্তন সাধন করেছেন। তবে এই রূপান্তরের নেপথ্যে কিছু কাঠামোগত প্রশ্নও থেকে যায়। ছাদের সৌরবিদ্যুতে সম্পন্ন ব্যক্তিরা গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমালেও সঞ্চালন লাইন বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণের মতো স্থায়ী গ্রিডের খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ব্যবহারকারীদের ঘাড়েই চাপে। ফলে একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক রূপান্তরের রূপরেখা তৈরি করাও সরকারের নীতিপ্রণেতাদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রেও আমাদের নীতিগত অভিপ্রায় এবং বাস্তবায়নের ফারাক স্পষ্ট। নেপালে চার্জিং অবকাঠামো ও কর ছাড় ইভি খাতকে এগিয়ে নিলেও, বাংলাদেশে উচ্চ আমদানি শুল্ক, চার্জিং স্টেশনের অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে এটি এখনো সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। যদিও সরকার সাম্প্রতিক বাজেটে বৈদ্যুতিক বাস, ট্রাক ও চার্জিং স্টেশনের ওপর করভার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, তবুও শেষ পর্যন্ত এই সুবিধা সাধারণ মানুষের না কি কেবল অভিজাত শ্রেণির হাতে গিয়ে পৌঁছাবে, তা নজরদারির বিষয়। পাশাপাশি, ইভি চালনার বিদ্যুৎ যদি শেষ পর্যন্ত আমদানি করা কয়লা বা গ্যাস থেকেই আসে, তবে তেলের বিল কমলেও সার্বিক আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। অন্যদিকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা কেবল বর্ষানির্ভর মৌসুমি সমাধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নেপাল থেকে ভারতের মধ্য দিয়ে যে সামান্য বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসছে, তা শীতকালীন তীব্র চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তাই কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে; কিন্তু এই ধরনের বৈশ্বিক ঝাপটায় আমাদের অর্থনীতি কতটা কেঁপে উঠবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আমাদের নিজস্ব দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর। স্বল্পমেয়াদে অন্তত ৩০ দিনের কৌশলগত জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা, তথ্যপ্রবাহ স্বচ্ছ রাখা, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ ও ইভি খাতের সঠিক অবকাঠামোগত প্রসারের মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলকে একটি টেকসই সবুজ ভবিষ্যতের পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পরের কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের অপেক্ষায় না থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর এখনই সময় সম্মিলিতভাবে জ্বালানি স্বনির্ভরতার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বাস্তবায়ন করার।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাবি।

ট্যাগ:

অস্থির জ্বালানি বাজার: টেকসই রূপান্তরের পথ

প্রকাশ: ১০:০৬:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

মোঃ মাইনুদ্দিন হাওলাদার (মইন): জ্বালানি সংকটের ঘূর্ণাবর্ত এবং সবুজ রূপান্তর, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এক অনিবার্য পঠনপাঠন। আপনার এই চমৎকার ও বিশ্লেষণসমৃদ্ধ লেখাটিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় বা উপ-সম্পাদকীয় পাতার উপযোগিতা ও গদ্যপ্রবাহে ঢেলে সাজানো হলো। পত্রিকার পাতার প্রাতিষ্ঠানিক ও মননশীল টোন বজায় রেখে এতে ভেতরের কোনো উপশিরোনাম রাখা হয়নি, বরং অনুচ্ছেদের স্বাভাবিক প্রবাহ ও যুক্তির ধারাবাহিকতায় পুরো বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

গত মার্চ মাসের শুরুতে ঢাকার পেট্রলপাম্পগুলোর সামনে ডেলিভারি রাইডার ও অফিসযাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আমাদের জ্বালানি খাতের ভঙ্গুর বাস্তবতাকে নতুন করে চোখের আঙুলে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল। মোটরসাইকেলের জন্য দুই লিটার আর ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য দশ লিটার জ্বালানির রেশনিং সেই দিনগুলোতে অনেকেরই জীবনযাত্রা থমকে দিয়েছিল। অথচ এই সংকটের উৎস ঢাকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালিতে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই কৌশলগত এই প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং এলএনজির প্রায় সমপরিমাণ অংশ এই পথ দিয়েই সরবরাহ হতো। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাসকয়েক পেরিয়ে গেলেও জাহাজ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের হিসাব বলছে, হরমুজ দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো অনেক নিচে। অর্থাৎ, বৈশ্বিক জ্বালানির এই মহাসড়কে ঝড়ের শঙ্কা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি।

এই ভূরাজনৈতিক উত্তাপের আঁচ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশে আলাদাভাবে লেগেছে, যার বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে গ্যাসে। দেশের এলএনজির সিংহভাগই কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর পর দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীরা ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় এবং পরবর্তীতে ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে রিগ্যাসিফিকেশন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমে আসায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে তীব্র ধাক্কা লাগে। গ্রীষ্মের সেই দিনগুলোতে লোডশেডিং এক হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল দেড় হাজারের বেশি টেক্সটাইল মিল ও কলকারখানায়। অথচ ভারতের চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত থাকলেও ধাক্কাটা আসে রান্নার গ্যাসে। প্রয়োজনীয় এলপিজির প্রায় পুরোটাই হরমুজ হয়ে আসায় এবং মজুত অপ্রতুল থাকায় ভারতের সাধারণ পরিবারগুলোকে সরাসরি এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানে পেট্রলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির পারদ চড়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই আঞ্চলিক জ্বালানি বিঘ্নের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা শ্রীলঙ্কার মতো সংকটকবলিত দেশের অর্থনীতিকে আরও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

সংকটের এই দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল আতঙ্ক এবং আস্থার সংকট মোকাবিলা করা। বাংলাদেশে ডিজেলের বিক্রি হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ঘাটতির ভয়। কিন্তু কেবল নিষেধাজ্ঞা বা রেশনিং দিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন তথ্যগত স্বচ্ছতা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও দেশীয় বিশ্লেষকদের মতে, দেশের জ্বালানির মজুত ঠিক কত দিনের এবং পরবর্তী চালানগুলো কবে এসে পৌঁছাবে, এই তথ্যগুলো নিয়মিত প্রকাশ করলে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা ও অযৌক্তিক লাইন অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হতো। একই সঙ্গে ভর্তুকির প্রচলিত সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। সবাইকে এক ছাতার নিচে ভর্তুকি দিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়, তা টেকসই হতে পারে না। এর পরিবর্তে নিম্নআয়ের পরিবার কিংবা কৃষি খাতের সেচের মতো অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিলে সীমিত রিসোর্সে অনেক বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব। তাছাড়া আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ বা বিকল্প শোধনাগারের ওপর সাময়িক ভরসা করা গেলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

তবে আশার আলো দেখা যাচ্ছে জ্বালানি রূপান্তরের অন্য একটি দিগন্তে, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ প্রতিবেশী পাকিস্তানের ছাদের সৌরবিদ্যুৎ বিপ্লব। দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌর প্যানেলের নজিরবিহীন আমদানির ফলে কোটি কোটি ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে এবং সংকটকালেও বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বিরাট ভূমিকা রেখেছে। এই রূপান্তরটি কোনো একক সরকারি মেগা প্রকল্পের ফসল নয়, বরং আমদানিতে সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং সাশ্রয়ী মূল্যের চীনা প্যানেলের সুবাদে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা স্বউদ্যোগে এই পরিবর্তন সাধন করেছেন। তবে এই রূপান্তরের নেপথ্যে কিছু কাঠামোগত প্রশ্নও থেকে যায়। ছাদের সৌরবিদ্যুতে সম্পন্ন ব্যক্তিরা গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমালেও সঞ্চালন লাইন বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণের মতো স্থায়ী গ্রিডের খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ব্যবহারকারীদের ঘাড়েই চাপে। ফলে একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক রূপান্তরের রূপরেখা তৈরি করাও সরকারের নীতিপ্রণেতাদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রেও আমাদের নীতিগত অভিপ্রায় এবং বাস্তবায়নের ফারাক স্পষ্ট। নেপালে চার্জিং অবকাঠামো ও কর ছাড় ইভি খাতকে এগিয়ে নিলেও, বাংলাদেশে উচ্চ আমদানি শুল্ক, চার্জিং স্টেশনের অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে এটি এখনো সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। যদিও সরকার সাম্প্রতিক বাজেটে বৈদ্যুতিক বাস, ট্রাক ও চার্জিং স্টেশনের ওপর করভার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, তবুও শেষ পর্যন্ত এই সুবিধা সাধারণ মানুষের না কি কেবল অভিজাত শ্রেণির হাতে গিয়ে পৌঁছাবে, তা নজরদারির বিষয়। পাশাপাশি, ইভি চালনার বিদ্যুৎ যদি শেষ পর্যন্ত আমদানি করা কয়লা বা গ্যাস থেকেই আসে, তবে তেলের বিল কমলেও সার্বিক আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। অন্যদিকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা কেবল বর্ষানির্ভর মৌসুমি সমাধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নেপাল থেকে ভারতের মধ্য দিয়ে যে সামান্য বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসছে, তা শীতকালীন তীব্র চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তাই কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে; কিন্তু এই ধরনের বৈশ্বিক ঝাপটায় আমাদের অর্থনীতি কতটা কেঁপে উঠবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আমাদের নিজস্ব দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর। স্বল্পমেয়াদে অন্তত ৩০ দিনের কৌশলগত জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা, তথ্যপ্রবাহ স্বচ্ছ রাখা, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ ও ইভি খাতের সঠিক অবকাঠামোগত প্রসারের মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলকে একটি টেকসই সবুজ ভবিষ্যতের পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পরের কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের অপেক্ষায় না থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর এখনই সময় সম্মিলিতভাবে জ্বালানি স্বনির্ভরতার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বাস্তবায়ন করার।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাবি।