০৭:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলবায়ু সংকট: আজকের সিদ্ধান্তে আগামীর ভবিষ্যৎ

মো: মুরছালিন উৎসব: জলবায়ু পরিবর্তনের করাল গ্রাসে কোনো একটি ঘর যখন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়, তখন ধ্বংস কেবল চার দেয়াল আর একটি চালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পানিতে ডুবে যায় একটি পরিবারের বহু বছরের জমানো সঞ্চয়, একজন কৃষকের সারাজীবনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল, সন্তানের সোনালী শিক্ষার স্বপ্ন এবং পুরো পরিবারের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল বাড়তে থাকা তাপমাত্রা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। এর প্রকৃত ভয়াবহতা ও মানবিক পরিণতি বুঝতে হলে আমাদের তাকানো উচিত সেইসব মানুষের মুখের দিকে, প্রতিবার দুর্যোগের থাবা কাটিয়ে যাদের জীবন একেবারে শূন্য থেকে নতুন করে শুরু করতে হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক ভয় নয়; এটি আজকের নির্মম বাস্তব। বন্যা, খরা, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়, তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠের আশঙ্কাজনক উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মানবিক বিপর্যয় আজ পৃথিবীর প্রতিটি কোণে দৃশ্যমান। কোথাও অসহনীয় তাপদাহে সাধারণ মানুষের পক্ষে জীবন ধারণ করাই অসম্ভব হয়ে উঠছে; কোথাও দীর্ঘ খরায় চৌচির হয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ; আবার কোথাও বা ক্ষণিকের মুষলধারে বৃষ্টি আর আকস্মিক বন্যা নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদ ও জীবিকা।

এই সংকটের সবচেয়ে বিদ্রূপাত্মক ও অন্যায় দিক হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতগুলো কোনো সুষম বণ্টনে ঘটছে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাদের কার্বন নিঃসরণের হার সবচেয়ে কম, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বোচ্চ মূল্য চোকাচ্ছে। ফলে বিশ্বের প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কৃষক, চা-বাগান ও ক্ষেতের শ্রমিক, উপকূলীয় সম্প্রদায় এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর কোটি কোটি মানুষ আজ জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিকার।

জলবায়ু সংকটের এই নিদারুণ বৈপরীত্য ও বিষম পরিণতি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। দেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন প্রতিদিনের ঘূর্ণিঝড়, মারাত্মক জলোচ্ছ্বাস, জমিতে নতুন নতুন লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং ধারাবাহিক নদীতীর ক্ষয়ের মতো বহুমাত্রিক হুমকির সাথে বাঁধা। একই সময়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অনিয়মিত বন্যা ও নদীভাঙন মানুষের ভিটেমাটি, চাষযোগ্য জমি এবং উপার্জনের পথকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। স্পষ্টতই, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কেবল পরিবেশগত কোনো একক চ্যালেঞ্জ নয়; বরং এটি আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং উদ্বাস্তু সমস্যার মতো জটিল মানবিক ও সামাজিক সংকট সৃষ্টি করছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে আসে তাদের ওপরই, যাদের দুর্যোগ পরবর্তী ধাক্কা সামলে উঠে দ্রুত পুনর্গঠনের সক্ষমতা বা সঞ্চয় সবচেয়ে কম। বন্যায় যখন একজন কৃষকের পুরো মৌসুমের ফসল ভেসে যায়, তখন শুধু একটি ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয় না, তার দেনা ও ঋণ পরিশোধের পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, পরিবারের থালায় খাবার জোগানো কঠিন হয়ে যায় এবং অর্থের অভাবে শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে, কয়েক সপ্তাহ কাজ না পেলে একজন দিনমজুরের পুরো সংসার গুরুতর খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। যখন একটি ঘর ভেসে যায়, মানুষ কেবল মাথার ওপরের ছাদ আর চারটি দেয়ালই হারায় না, তারা হারায় তাদের নিরাপদ অস্তিত্ব।

অতএব, দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর কেবল সাময়িক বা অপর্যাপ্ত ত্রাণ দিয়েই সেই বিশাল ক্ষতির দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্তদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না; কারণ দুর্যোগের ক্ষ ক্ষতচিহ্ন সহজে মেটে না।

দুর্যোগের পরপরই প্রয়োজন দ্রুত উদ্ধারকাজ, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানীয় জল, পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। তবে কেবল দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণই যথেষ্ট নয়; সমানভাবে প্রয়োজন দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করা। কার্যকর ও আধুনিক প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে সুসংগঠিত প্রস্তুতি, প্রথম ধাক্কা সামলানোর মতো নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের কাছে নিমিষে জরুরি তথ্য পৌঁছানোর যোগাযোগব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা গেলে বহু প্রাণ ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ বাঁচানো সম্ভব।

একই সাথে, বিপর্যয় কাটিয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। ফসল হারানো কৃষককে আবার বীজ ও কৃষি উপকরণ দিয়ে মাঠে ফেরাতে হবে; চাকরি বা কাজ হারানো শ্রমিকের জন্য দ্রুত আয় এবং সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেবল ভাঙা ঘর মেরামত করলেই চলবে না; তাদের টেকসই ও নিরাপদ পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি করে দিতে হবে। জলবায়ু দুর্যোগের মুহূর্তে বিপন্ন মানুষের শুধু বেঁচে থাকার সাময়িক অনুদান নয়, প্রয়োজন এমন এক সমর্থনব্যবস্থা, যাতে দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর তারা আবার নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অনুদান বা সাময়িক সহায়তা দেওয়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। জলবায়ু সংকটের সার্বিক ক্ষতি রোধ করতে হলে আমাদের মূলত দুটি প্রধান বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে: এক, বর্তমান ঝুঁকি কমানো; এবং দুই, ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মাত্রা প্রতিহত করা।

প্রথমত, আমাদের বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আমূল ও দ্রুত হারে কমাতে হবে। কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে এনে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। কারণ সার্বিক নিঃসরণ না কমালে কোনো প্রযুক্তি দিয়েই দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে হবে। টেকসই উপকূলীয় বাঁধ, বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, অত্যাধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল ও উদ্ভাবনী কৃষি পদ্ধতি, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-বান্ধব নগর অবকাঠামোর জন্য বড় আকারের বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি। বাস্তবে, দুর্যোগ আঘাত হানার পর কোটি কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি পূরণে ব্যয় করার চেয়ে দুর্যোগের আগে নিরাপদ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও যুক্তিযুক্ত।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত ও ন্যায়সংগত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন, পুনর্গঠন এবং ক্ষতির ক্ষতিপূরণের জন্য যে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বাস্তব অর্থে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় রূপান্তর করতে হবে। জলবায়ু অর্থায়ন কেবল বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রকৃতপক্ষে মাঠ পর্যায়ে যেখানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি ও ক্ষতি রয়েছে, সেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে তা পৌঁছাতে হবে।

চতুর্থত, সুদৃঢ় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত কার্বনের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই, আর সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান জলোচ্ছ্বাসও কোনো দেশের সীমান্ত চেনে না। ফলস্বরূপ, জলবায়ুর এই মহাসংকট কোনো একটি দেশ এককভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না।

হিমালয়ে বরফ গলার দৃশ্য হোক, আফ্রিকায় মারাত্মক খরার থাবা হোক, ইউরোপজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহ হোক, কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা হোক, অথবা বাংলাদেশে নদীতীর ও উপকূলীয় ঝুঁকিতে বসবাসকারী মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রাম হোক, স্থানভেদে দৃশ্যপট ভিন্ন হলেও মূল সংকট একই সুতোয় গাঁথা।

তাই বর্তমান বিশ্বের আসল প্রশ্ন এটা নয় যে পৃথিবী আরও গরম হচ্ছে কি না; বরং প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনশীল ও চরম বিপজ্জনক পৃথিবীতে আমরা কীভাবে প্রতিটি মানুষকে নিরাপদ রাখব?

এক্ষেত্রে আমাদের দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করতে হবে: একদিকে যাদের জীবন ইতোমধ্যে বিধ্বংসী দুর্যোগে ছারখার হয়ে গেছে, তাদের পাশে আমাদের জোরালোভাবে দাঁড়াতে হবে; অন্যদিকে ভবিষ্যৎ ক্ষতি থামাতে যা যা করণীয়, তা অতি দ্রুত সম্পাদন করতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এক পৃথিবীতে প্রস্তুতির আগে কেবল ত্রাণ কোনো স্থায়ী অর্থ বহন করে না। প্রাণ বাঁচানোর পাশাপাশি মানুষের জীবিকা, ঘরবাড়ি ও স্বপ্ন রক্ষা করতে হবে এবং নতুন করে ভবিষ্যৎ গড়ার সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনকে হয়তো পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া এখন আর সম্ভব নয়, কিন্তু এর ধ্বংসাত্মক মাত্রা কতটা হ্রাস করা যাবে, তা নির্ভর করছে আজকে আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপগুলোর ওপর।

আমরা যদি এখনই ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ কমাই, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার চাদরে ঢেকে দিই, টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াগুলোকে নতুনভাবে সাজাই, তবে আগামী দিনের ইতিহাস কেবল ক্রমান্বয়ে আসা দুর্যোগের গল্প হয়ে থাকবে না, বরং তা হবে মানবজাতির ঘুরে দাঁড়ানোর এক নতুন ইতিহাস।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ:

জলবায়ু সংকট: আজকের সিদ্ধান্তে আগামীর ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ১১:১৩:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মো: মুরছালিন উৎসব: জলবায়ু পরিবর্তনের করাল গ্রাসে কোনো একটি ঘর যখন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়, তখন ধ্বংস কেবল চার দেয়াল আর একটি চালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পানিতে ডুবে যায় একটি পরিবারের বহু বছরের জমানো সঞ্চয়, একজন কৃষকের সারাজীবনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল, সন্তানের সোনালী শিক্ষার স্বপ্ন এবং পুরো পরিবারের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল বাড়তে থাকা তাপমাত্রা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। এর প্রকৃত ভয়াবহতা ও মানবিক পরিণতি বুঝতে হলে আমাদের তাকানো উচিত সেইসব মানুষের মুখের দিকে, প্রতিবার দুর্যোগের থাবা কাটিয়ে যাদের জীবন একেবারে শূন্য থেকে নতুন করে শুরু করতে হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক ভয় নয়; এটি আজকের নির্মম বাস্তব। বন্যা, খরা, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়, তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠের আশঙ্কাজনক উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মানবিক বিপর্যয় আজ পৃথিবীর প্রতিটি কোণে দৃশ্যমান। কোথাও অসহনীয় তাপদাহে সাধারণ মানুষের পক্ষে জীবন ধারণ করাই অসম্ভব হয়ে উঠছে; কোথাও দীর্ঘ খরায় চৌচির হয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ; আবার কোথাও বা ক্ষণিকের মুষলধারে বৃষ্টি আর আকস্মিক বন্যা নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদ ও জীবিকা।

এই সংকটের সবচেয়ে বিদ্রূপাত্মক ও অন্যায় দিক হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতগুলো কোনো সুষম বণ্টনে ঘটছে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাদের কার্বন নিঃসরণের হার সবচেয়ে কম, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বোচ্চ মূল্য চোকাচ্ছে। ফলে বিশ্বের প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কৃষক, চা-বাগান ও ক্ষেতের শ্রমিক, উপকূলীয় সম্প্রদায় এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর কোটি কোটি মানুষ আজ জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিকার।

জলবায়ু সংকটের এই নিদারুণ বৈপরীত্য ও বিষম পরিণতি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। দেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন প্রতিদিনের ঘূর্ণিঝড়, মারাত্মক জলোচ্ছ্বাস, জমিতে নতুন নতুন লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং ধারাবাহিক নদীতীর ক্ষয়ের মতো বহুমাত্রিক হুমকির সাথে বাঁধা। একই সময়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অনিয়মিত বন্যা ও নদীভাঙন মানুষের ভিটেমাটি, চাষযোগ্য জমি এবং উপার্জনের পথকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। স্পষ্টতই, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কেবল পরিবেশগত কোনো একক চ্যালেঞ্জ নয়; বরং এটি আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং উদ্বাস্তু সমস্যার মতো জটিল মানবিক ও সামাজিক সংকট সৃষ্টি করছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে আসে তাদের ওপরই, যাদের দুর্যোগ পরবর্তী ধাক্কা সামলে উঠে দ্রুত পুনর্গঠনের সক্ষমতা বা সঞ্চয় সবচেয়ে কম। বন্যায় যখন একজন কৃষকের পুরো মৌসুমের ফসল ভেসে যায়, তখন শুধু একটি ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয় না, তার দেনা ও ঋণ পরিশোধের পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, পরিবারের থালায় খাবার জোগানো কঠিন হয়ে যায় এবং অর্থের অভাবে শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে, কয়েক সপ্তাহ কাজ না পেলে একজন দিনমজুরের পুরো সংসার গুরুতর খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। যখন একটি ঘর ভেসে যায়, মানুষ কেবল মাথার ওপরের ছাদ আর চারটি দেয়ালই হারায় না, তারা হারায় তাদের নিরাপদ অস্তিত্ব।

অতএব, দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর কেবল সাময়িক বা অপর্যাপ্ত ত্রাণ দিয়েই সেই বিশাল ক্ষতির দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্তদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না; কারণ দুর্যোগের ক্ষ ক্ষতচিহ্ন সহজে মেটে না।

দুর্যোগের পরপরই প্রয়োজন দ্রুত উদ্ধারকাজ, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানীয় জল, পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। তবে কেবল দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণই যথেষ্ট নয়; সমানভাবে প্রয়োজন দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করা। কার্যকর ও আধুনিক প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে সুসংগঠিত প্রস্তুতি, প্রথম ধাক্কা সামলানোর মতো নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের কাছে নিমিষে জরুরি তথ্য পৌঁছানোর যোগাযোগব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা গেলে বহু প্রাণ ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ বাঁচানো সম্ভব।

একই সাথে, বিপর্যয় কাটিয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। ফসল হারানো কৃষককে আবার বীজ ও কৃষি উপকরণ দিয়ে মাঠে ফেরাতে হবে; চাকরি বা কাজ হারানো শ্রমিকের জন্য দ্রুত আয় এবং সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেবল ভাঙা ঘর মেরামত করলেই চলবে না; তাদের টেকসই ও নিরাপদ পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি করে দিতে হবে। জলবায়ু দুর্যোগের মুহূর্তে বিপন্ন মানুষের শুধু বেঁচে থাকার সাময়িক অনুদান নয়, প্রয়োজন এমন এক সমর্থনব্যবস্থা, যাতে দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর তারা আবার নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অনুদান বা সাময়িক সহায়তা দেওয়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। জলবায়ু সংকটের সার্বিক ক্ষতি রোধ করতে হলে আমাদের মূলত দুটি প্রধান বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে: এক, বর্তমান ঝুঁকি কমানো; এবং দুই, ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মাত্রা প্রতিহত করা।

প্রথমত, আমাদের বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আমূল ও দ্রুত হারে কমাতে হবে। কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে এনে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। কারণ সার্বিক নিঃসরণ না কমালে কোনো প্রযুক্তি দিয়েই দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে হবে। টেকসই উপকূলীয় বাঁধ, বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, অত্যাধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল ও উদ্ভাবনী কৃষি পদ্ধতি, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-বান্ধব নগর অবকাঠামোর জন্য বড় আকারের বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি। বাস্তবে, দুর্যোগ আঘাত হানার পর কোটি কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি পূরণে ব্যয় করার চেয়ে দুর্যোগের আগে নিরাপদ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও যুক্তিযুক্ত।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত ও ন্যায়সংগত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন, পুনর্গঠন এবং ক্ষতির ক্ষতিপূরণের জন্য যে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বাস্তব অর্থে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় রূপান্তর করতে হবে। জলবায়ু অর্থায়ন কেবল বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রকৃতপক্ষে মাঠ পর্যায়ে যেখানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি ও ক্ষতি রয়েছে, সেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে তা পৌঁছাতে হবে।

চতুর্থত, সুদৃঢ় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত কার্বনের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই, আর সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান জলোচ্ছ্বাসও কোনো দেশের সীমান্ত চেনে না। ফলস্বরূপ, জলবায়ুর এই মহাসংকট কোনো একটি দেশ এককভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না।

হিমালয়ে বরফ গলার দৃশ্য হোক, আফ্রিকায় মারাত্মক খরার থাবা হোক, ইউরোপজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহ হোক, কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা হোক, অথবা বাংলাদেশে নদীতীর ও উপকূলীয় ঝুঁকিতে বসবাসকারী মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রাম হোক, স্থানভেদে দৃশ্যপট ভিন্ন হলেও মূল সংকট একই সুতোয় গাঁথা।

তাই বর্তমান বিশ্বের আসল প্রশ্ন এটা নয় যে পৃথিবী আরও গরম হচ্ছে কি না; বরং প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনশীল ও চরম বিপজ্জনক পৃথিবীতে আমরা কীভাবে প্রতিটি মানুষকে নিরাপদ রাখব?

এক্ষেত্রে আমাদের দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করতে হবে: একদিকে যাদের জীবন ইতোমধ্যে বিধ্বংসী দুর্যোগে ছারখার হয়ে গেছে, তাদের পাশে আমাদের জোরালোভাবে দাঁড়াতে হবে; অন্যদিকে ভবিষ্যৎ ক্ষতি থামাতে যা যা করণীয়, তা অতি দ্রুত সম্পাদন করতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এক পৃথিবীতে প্রস্তুতির আগে কেবল ত্রাণ কোনো স্থায়ী অর্থ বহন করে না। প্রাণ বাঁচানোর পাশাপাশি মানুষের জীবিকা, ঘরবাড়ি ও স্বপ্ন রক্ষা করতে হবে এবং নতুন করে ভবিষ্যৎ গড়ার সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনকে হয়তো পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া এখন আর সম্ভব নয়, কিন্তু এর ধ্বংসাত্মক মাত্রা কতটা হ্রাস করা যাবে, তা নির্ভর করছে আজকে আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপগুলোর ওপর।

আমরা যদি এখনই ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ কমাই, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার চাদরে ঢেকে দিই, টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াগুলোকে নতুনভাবে সাজাই, তবে আগামী দিনের ইতিহাস কেবল ক্রমান্বয়ে আসা দুর্যোগের গল্প হয়ে থাকবে না, বরং তা হবে মানবজাতির ঘুরে দাঁড়ানোর এক নতুন ইতিহাস।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়