১১:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তার জলসংকট: আঞ্চলিক সুরক্ষানীতি ও ভারসাম্য কূটনীতি

মোঃ আব্দুল্লাহ আলিফ: হিমালয়ের তিব্বতীয় মালভূমির ছো-লামো হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা অতিক্রম করে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে প্রবেশ করা তিস্তা নদী কেবল একটি ভৌগোলিক আন্তঃসীমান্ত জলপ্রবাহ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের উত্তর জনপদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত জীবনরেখা। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধার মতো দেশের উত্তর অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় তিন কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা, যার প্রায় ৭০ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল ও তিস্তার জলপ্রবাহের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

দুর্ভাগ্যবশত, এই অপরিহার্য প্রাকৃতিক সম্পদটিই আজ দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং জলবণ্টনের তীব্র অসমতার কারণে উত্তরবঙ্গের জন্য এক অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সেচকাজ ও সামগ্রিক জীবিকার প্রধান অবলম্বন এই তিস্তার পানিপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করে; যার বিপরীতে ১৯৯৬ সালে ভারত সরকার উজানের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে নদীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং বর্ষায় হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার রূঢ় বাস্তবতায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল একই সাথে তীব্র খরা ও কৃত্রিম বন্যার করাল গ্রাসে পতিত হচ্ছে।

এই একমুখী পানি প্রত্যাহারের ফলে ১৯৮৩ সালের যৌথ নদী কমিশনের সেই ঐতিহাসিক সূত্রটি (ভারত ৩৯%, বাংলাদেশ ৩৬% এবং স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য ২৫%) আজ সম্পূর্ণ অকার্যকর। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পানি সংকটের কারণে তিস্তা চরের প্রায় তিন হাজার একর আবাদি জমি এখন সম্পূর্ণ অনাবাদী পড়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইফপ্রি)-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, এই কৃত্রিম সংকটে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লক্ষ টন বোরো ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রাক্কলিত বাজারমূল্য প্রায় ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা, যা সামগ্রিক জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৯ শতাংশ বাড়তি অবদান রাখতে পারত।

তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো, গত ৫২ বছরে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের অর্ধশতাধিক বৈঠক সত্ত্বেও তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন চুক্তির কোনো কার্যকর সুরাহা হয়নি, যার পেছনে প্রতিবেশি ভারতের দীর্ঘসূত্রিতার পাশাপাশি অতীতে বাংলাদেশের পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক উপাত্ত ও দক্ষ কূটনৈতিক দরকষাকষিরও একধরনের ঘাটতি ছিল।

বিশেষ করে ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর আকস্মিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে চুক্তিটি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থেকে যায় এবং ঢাকা-দিল্লির অগ্রগতির প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।

এই দীর্ঘস্থায়ী জট ও কোটি মানুষের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ (টিআরসিএমআর) নামে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনার সমীক্ষা শুরু করে, যার মূল্যায়ন প্রতিবেদন ২০২৩ সালে শেষ হয়। এই মহাপরিকল্পনায় নদী খনন, দুই তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, ভূমি পুনরুদ্ধার, স্যাটেলাইট শহর এবং বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রকল্পে চীন যখন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে, তখন ভূকৌশলগত কারণে ভারতও হঠাৎ এই প্রকল্পে বিনিয়োগের তীব্র আগ্রহ দেখায় এবং শেখ হাসিনার সর্বশেষ দিল্লি সফরে ভারতকে এই প্রকল্প দেওয়ার একধরনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্প ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে হওয়ায় এখানে চীনের জোরালো উপস্থিতি দিল্লির জন্য গভীর কৌশলগত ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সমীকরণে এক নতুন বাঁক আসে।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ২০২৫ সালের মার্চ মাসে চারদিনের চীন সফরে চীনের দীর্ঘ ৫০ বছরের নদী ও বন্যা ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ঢাকার চারপাশের নদী দূষণমুক্তকরণে বেইজিংয়ের সরাসরি কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক মাস্টারপ্ল্যান সহায়তা কামনা করেন। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরেও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা ও মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে থাকে।

বিশেষ করে ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর বিএনপির দ্বিতীয় সারির শীর্ষ নেতৃত্ব ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী আসাদুল হাবীব দুলুর নেতৃত্বে তিস্তাপাড়ের ১১টি পয়েন্টে ১০৫ কিলোমিটার ব্যাপী একযোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের মশাল জ্বালিয়ে ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাও’ কর্মসূচি অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান কাজ শুরু করার এক শক্তিশালী আল্টিমেটাম দেয়, যা এই আন্দোলনকে জাতীয় দাবিতে রূপান্তর করে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান দেয়। গত মে মাসে বেইজিং সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান স্পষ্ট করেই বলেন, তিস্তা অববাহিকার মানুষের মরণ-বাঁচনের এই সমস্যা সুরাহা করা প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অঙ্গীকার এবং ভারতের মনস্তত্ত্ব পড়ার চেয়ে বাংলাদেশের নিজেদের কাজ নিজেদের করাই এখন মূল লক্ষ্য। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ জুন ২০২৬-এ তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শনে গিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি দ্রুততম সময়ে এই মহাপরিকল্পনা একনেকে পাসের ঘোষণা দেন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু নিজস্ব অর্থায়নেও এটি বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যা সরকারের দৃঢ় অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দেশটির সাথে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নয়াদিল্লির নীতিগত টেবিলে গভীর উদ্বেগ দেখা গেছে। তবে ভারতের এই কৌশলগত অস্বস্তির জবাবে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ঢাকা-বেইজিং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি যেকোনো বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত।

সফর শেষে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্য, ‘আমি দেশের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছি ও স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছি, যেকোনো অর্জনই দেশের অর্জন’, প্রমাণ করে যে বর্তমান প্রশাসন তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ তত্ত্বকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

প্রায় দুই কোটি মানুষের ভাগ্য ও উত্তরবঙ্গের মরণ-বাঁচনের প্রশ্নে বাংলাদেশ আর কোনো বিদেশি শক্তির আশ্বাসে অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা না করে চীনের উন্নত ও সাশ্রয়ী কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। পানি ব্যবস্থাপনা এবং নদীর দুই তীরে আধুনিক স্যাটেলাইট শহর ও অবকাঠামো নির্মাণে চীনের দক্ষতা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল ও সাশ্রয়ী বিকল্প।

তবে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে কোনো একক পরাশক্তির প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে ঋণের ফাঁদ বা সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি তৈরি না হয়। বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে গ্রহণ করার পাশাপাশি ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিবেশির সাথেও ভৌগোলিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতা। তিস্তা প্রকল্প এখন কেবল নদী শাসনের বিষয় নয়, এটি মূলত পরাশক্তিদের টানাপোড়েনের মাঝে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের এক মহতী পরীক্ষা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই লেখকের।)

ট্যাগ:

তিস্তার জলসংকট: আঞ্চলিক সুরক্ষানীতি ও ভারসাম্য কূটনীতি

প্রকাশ: ০৬:০৩:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

মোঃ আব্দুল্লাহ আলিফ: হিমালয়ের তিব্বতীয় মালভূমির ছো-লামো হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা অতিক্রম করে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে প্রবেশ করা তিস্তা নদী কেবল একটি ভৌগোলিক আন্তঃসীমান্ত জলপ্রবাহ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের উত্তর জনপদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত জীবনরেখা। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধার মতো দেশের উত্তর অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় তিন কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা, যার প্রায় ৭০ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল ও তিস্তার জলপ্রবাহের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

দুর্ভাগ্যবশত, এই অপরিহার্য প্রাকৃতিক সম্পদটিই আজ দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং জলবণ্টনের তীব্র অসমতার কারণে উত্তরবঙ্গের জন্য এক অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সেচকাজ ও সামগ্রিক জীবিকার প্রধান অবলম্বন এই তিস্তার পানিপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করে; যার বিপরীতে ১৯৯৬ সালে ভারত সরকার উজানের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে নদীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং বর্ষায় হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার রূঢ় বাস্তবতায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল একই সাথে তীব্র খরা ও কৃত্রিম বন্যার করাল গ্রাসে পতিত হচ্ছে।

এই একমুখী পানি প্রত্যাহারের ফলে ১৯৮৩ সালের যৌথ নদী কমিশনের সেই ঐতিহাসিক সূত্রটি (ভারত ৩৯%, বাংলাদেশ ৩৬% এবং স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য ২৫%) আজ সম্পূর্ণ অকার্যকর। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পানি সংকটের কারণে তিস্তা চরের প্রায় তিন হাজার একর আবাদি জমি এখন সম্পূর্ণ অনাবাদী পড়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইফপ্রি)-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, এই কৃত্রিম সংকটে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লক্ষ টন বোরো ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রাক্কলিত বাজারমূল্য প্রায় ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা, যা সামগ্রিক জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৯ শতাংশ বাড়তি অবদান রাখতে পারত।

তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো, গত ৫২ বছরে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের অর্ধশতাধিক বৈঠক সত্ত্বেও তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন চুক্তির কোনো কার্যকর সুরাহা হয়নি, যার পেছনে প্রতিবেশি ভারতের দীর্ঘসূত্রিতার পাশাপাশি অতীতে বাংলাদেশের পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক উপাত্ত ও দক্ষ কূটনৈতিক দরকষাকষিরও একধরনের ঘাটতি ছিল।

বিশেষ করে ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর আকস্মিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে চুক্তিটি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থেকে যায় এবং ঢাকা-দিল্লির অগ্রগতির প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।

এই দীর্ঘস্থায়ী জট ও কোটি মানুষের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ (টিআরসিএমআর) নামে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনার সমীক্ষা শুরু করে, যার মূল্যায়ন প্রতিবেদন ২০২৩ সালে শেষ হয়। এই মহাপরিকল্পনায় নদী খনন, দুই তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, ভূমি পুনরুদ্ধার, স্যাটেলাইট শহর এবং বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রকল্পে চীন যখন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে, তখন ভূকৌশলগত কারণে ভারতও হঠাৎ এই প্রকল্পে বিনিয়োগের তীব্র আগ্রহ দেখায় এবং শেখ হাসিনার সর্বশেষ দিল্লি সফরে ভারতকে এই প্রকল্প দেওয়ার একধরনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্প ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে হওয়ায় এখানে চীনের জোরালো উপস্থিতি দিল্লির জন্য গভীর কৌশলগত ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সমীকরণে এক নতুন বাঁক আসে।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ২০২৫ সালের মার্চ মাসে চারদিনের চীন সফরে চীনের দীর্ঘ ৫০ বছরের নদী ও বন্যা ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ঢাকার চারপাশের নদী দূষণমুক্তকরণে বেইজিংয়ের সরাসরি কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক মাস্টারপ্ল্যান সহায়তা কামনা করেন। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরেও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা ও মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে থাকে।

বিশেষ করে ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর বিএনপির দ্বিতীয় সারির শীর্ষ নেতৃত্ব ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী আসাদুল হাবীব দুলুর নেতৃত্বে তিস্তাপাড়ের ১১টি পয়েন্টে ১০৫ কিলোমিটার ব্যাপী একযোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের মশাল জ্বালিয়ে ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাও’ কর্মসূচি অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান কাজ শুরু করার এক শক্তিশালী আল্টিমেটাম দেয়, যা এই আন্দোলনকে জাতীয় দাবিতে রূপান্তর করে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান দেয়। গত মে মাসে বেইজিং সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান স্পষ্ট করেই বলেন, তিস্তা অববাহিকার মানুষের মরণ-বাঁচনের এই সমস্যা সুরাহা করা প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অঙ্গীকার এবং ভারতের মনস্তত্ত্ব পড়ার চেয়ে বাংলাদেশের নিজেদের কাজ নিজেদের করাই এখন মূল লক্ষ্য। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ জুন ২০২৬-এ তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শনে গিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি দ্রুততম সময়ে এই মহাপরিকল্পনা একনেকে পাসের ঘোষণা দেন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু নিজস্ব অর্থায়নেও এটি বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যা সরকারের দৃঢ় অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দেশটির সাথে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নয়াদিল্লির নীতিগত টেবিলে গভীর উদ্বেগ দেখা গেছে। তবে ভারতের এই কৌশলগত অস্বস্তির জবাবে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ঢাকা-বেইজিং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি যেকোনো বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত।

সফর শেষে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্য, ‘আমি দেশের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছি ও স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছি, যেকোনো অর্জনই দেশের অর্জন’, প্রমাণ করে যে বর্তমান প্রশাসন তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ তত্ত্বকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

প্রায় দুই কোটি মানুষের ভাগ্য ও উত্তরবঙ্গের মরণ-বাঁচনের প্রশ্নে বাংলাদেশ আর কোনো বিদেশি শক্তির আশ্বাসে অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা না করে চীনের উন্নত ও সাশ্রয়ী কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। পানি ব্যবস্থাপনা এবং নদীর দুই তীরে আধুনিক স্যাটেলাইট শহর ও অবকাঠামো নির্মাণে চীনের দক্ষতা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল ও সাশ্রয়ী বিকল্প।

তবে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে কোনো একক পরাশক্তির প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে ঋণের ফাঁদ বা সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি তৈরি না হয়। বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে গ্রহণ করার পাশাপাশি ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিবেশির সাথেও ভৌগোলিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতা। তিস্তা প্রকল্প এখন কেবল নদী শাসনের বিষয় নয়, এটি মূলত পরাশক্তিদের টানাপোড়েনের মাঝে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের এক মহতী পরীক্ষা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই লেখকের।)