১১:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তার বহুমাত্রিকতা: কূটনৈতিক আস্থার পরীক্ষাক্ষেত্র

লেখক

সাদিয়া রহমান: বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ভিত্তি। ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও পারষ্পরিক সংযোগ, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের অংশীদারিত্ব গত দশকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিলো। কিন্তু এই দৃশ্যমান বন্ধুত্বের আবহেও একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি। দীর্ঘ আলোচনার পরও এই চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় বিষয়টি এখন আর শুধু শুষ্ক পানি ব্যবস্থাপনার কারিগরি সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মূলত রূপ নিয়েছে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যতের এক কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্রে।

হিমালয়ের সিকিম অঞ্চলে উৎপন্ন হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এবং পরবর্তীতে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হওয়া এই আন্তর্জাতিক নদীর ওপর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ গভীরভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষকরা যখন সেচের জন্য এই নদীর পানির ওপর চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন, তখন শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় ব্যাহত হয় কৃষি উৎপাদন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য, এবং অঞ্চলটি ক্রমশ এক ভয়াবহ পরিবেশগত ঝুঁকির মুখোমুখি হয়।

এই সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি মূলত ২০১১ সালের এক কূটনৈতিক অচলাবস্থার সঙ্গে যুক্ত। সে বছর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সম্ভাব্য তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হয়ে যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিলেও ভারতের সংবিধান অনুযায়ী পানি একটি সংবেদনশীল রাজ্যভিত্তিক বিষয় হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তীব্র আপত্তির মুখে তা থমকে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তখন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, প্রস্তাবিত পানি বণ্টন ব্যবস্থা উত্তরবঙ্গের কৃষি ও জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই ঘটনাটি একটি রূঢ় আন্তর্জাতিক বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে, ভারতের ফেডারেল কাঠামোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কখনও কখনও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতটা বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। এরপর একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও রাজনৈতিক আলোচনা হলেও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়নি, যা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী হতাশার জন্ম দিয়েছে।

পরবর্তী উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিপুল অগ্রগতি সত্ত্বেও তিস্তা ইস্যুর এই স্থবিরতা অনেকের কাছে এক অসম্পূর্ণ অংশীদারিত্বের প্রতীক। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল প্রতিবেশী সম্পর্কের মূল ভিত্তিই হলো পারস্পরিক স্বার্থ ও আস্থার প্রতি সম্মান। ফলে তিস্তা সমস্যার সমাধান না হওয়া সেই আস্থার ভিত্তিকে কেবল দুর্বলই করছে না, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এটি এখন দিল্লির কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে, ভারতের নিজস্ব ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কার্যকারিতাও আজ এই একটি চুক্তির সফলতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। হিমালয়ের হিমবাহ গলন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এমনিতেই হুমকির মুখে। এই বাস্তবতায় যেকোনো একতরফা পদক্ষেপের পরিবর্তে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

তবে এই কারিগরি সমাধানের পথে শুধু রাজনৈতিক জটিলতাই নয়, জনমানসের তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসও একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। উভয় দেশের কিছু মহলে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা এবং ভুল তথ্য প্রচারের কারণে প্রায়শই বাস্তব চিত্রটি জনপরিসরে আড়াল হয়ে যায়। তাই উভয় দেশের তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের উচিত এই ইস্যুকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এনে বৈজ্ঞানিক ও মানবিক আলোকেই বিবেচনা করা।

অবশ্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ভারতের কেন্দ্রে নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা পূর্বের তুলনায় শক্তিশালী হওয়ায় এবং পশ্চিমবঙ্গেও কেন্দ্রের সমমনা রাজনৈতিক শক্তির নীতিগত সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার একটি তাত্ত্বিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অতীতে তিস্তা চুক্তির অন্যতম প্রধান বাধা ছিল পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও রেষারেষি। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আগমন সেই দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। এখন ভারতের কেন্দ্রে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় দুই সরকারের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছানোর এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমান এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সকল ক্ষেত্রে কেন্দ্র এখন তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে বৃহত্তর কৌশলগত গুরুত্ব লাভ করায় দিল্লির কাছে তিস্তা প্রশ্নটি কেবল একটি আঞ্চলিক নদী সমস্যা নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় কৃষি ও সেচের স্বার্থকে উপেক্ষা করে নয়, বরং উভয় দেশের স্বার্থের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল এই চুক্তির সফল বাস্তবায়ন সম্ভব।

তাছাড়া, তিস্তা ইস্যু এখন কেবল দ্বিপাক্ষিক পানি বণ্টনের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের বৃহত্তর ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট বলে যে, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবহার এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে উজান ও ভাটির উভয় দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে এবং কোনো পক্ষ অযৌক্তিক ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।

বাংলাদেশে তিস্তার পানিপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় নদীর তলদেশে পলি জমছে, শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা সংকট দেখা দিচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ায় উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মুখে পড়ছে। আবার একই সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম অঞ্চলের বাস্তব চাহিদাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। এই জটিল সমীকরণের মধ্যেই যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক নতুন মাত্রা, বিশেষ করে তিস্তা ইস্যুতে চীনের আগ্রহ।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীভিত্তিক খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ এবং সেচব্যবস্থার উন্নয়নে চীন যে বিপুল বিনিয়োগ ও কারিগরি আগ্রহ দেখিয়েছে, তা যেমন বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনি তা বেইজিংয়ের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত অংশও বটে। ভারত তিস্তাকে একটি সংবেদনশীল সীমান্তবর্তী নদী বিবেচনা করায় এই প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা স্বভাবতই ভারত-চীন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার এক নতুন ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে, যা তিস্তাকে শুধু পানির বিষয় থেকে সরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনীতির উপাদানে পরিণত করেছে।

এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে উত্তরণের পথটি তাই কেবল ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপের মধ্যে নয়, বরং খাঁটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শনের মধ্যেই নিহিত। ভারতকে তার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং বাংলাদেশকে তার গঠনমূলক ও সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, যেখানে যৌথ নদী কমিশনকে আরও কার্যকর ও সক্রিয় করা জরুরি।

পানি বণ্টনের পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিকূল রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও যদি ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ টিকে থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার তুলনামূলক পরিপক্ব সম্পর্কের আলোকে তিস্তা চুক্তিও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।

একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি পরিমাপ করা হয় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জটিলতম সমস্যাগুলোর ন্যায়সংগত সমাধানের মাধ্যমে। তিস্তা আজ সেই পরীক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। যদি দুই দেশ এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কাটিয়ে একটি ন্যায্য, গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে পারে, তবে তা শুধু দুই দেশের অববাহিকাবাসী কোটি মানুষের ভাগ্যবদলই করবে না, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, পারস্পরিক গভীর আস্থা এবং টেকসই স্থিতিশীলতার এক নতুন ও গৌরবময় দিগন্ত উন্মোচন করবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।  (প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই লেখকের।)

তিস্তার বহুমাত্রিকতা: কূটনৈতিক আস্থার পরীক্ষাক্ষেত্র

প্রকাশ: ০৮:২৮:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

সাদিয়া রহমান: বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ভিত্তি। ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও পারষ্পরিক সংযোগ, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের অংশীদারিত্ব গত দশকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিলো। কিন্তু এই দৃশ্যমান বন্ধুত্বের আবহেও একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি। দীর্ঘ আলোচনার পরও এই চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় বিষয়টি এখন আর শুধু শুষ্ক পানি ব্যবস্থাপনার কারিগরি সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মূলত রূপ নিয়েছে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যতের এক কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্রে।

হিমালয়ের সিকিম অঞ্চলে উৎপন্ন হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এবং পরবর্তীতে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হওয়া এই আন্তর্জাতিক নদীর ওপর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ গভীরভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষকরা যখন সেচের জন্য এই নদীর পানির ওপর চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন, তখন শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় ব্যাহত হয় কৃষি উৎপাদন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য, এবং অঞ্চলটি ক্রমশ এক ভয়াবহ পরিবেশগত ঝুঁকির মুখোমুখি হয়।

এই সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি মূলত ২০১১ সালের এক কূটনৈতিক অচলাবস্থার সঙ্গে যুক্ত। সে বছর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সম্ভাব্য তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হয়ে যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিলেও ভারতের সংবিধান অনুযায়ী পানি একটি সংবেদনশীল রাজ্যভিত্তিক বিষয় হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তীব্র আপত্তির মুখে তা থমকে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তখন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, প্রস্তাবিত পানি বণ্টন ব্যবস্থা উত্তরবঙ্গের কৃষি ও জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই ঘটনাটি একটি রূঢ় আন্তর্জাতিক বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে, ভারতের ফেডারেল কাঠামোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কখনও কখনও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতটা বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। এরপর একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও রাজনৈতিক আলোচনা হলেও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়নি, যা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী হতাশার জন্ম দিয়েছে।

পরবর্তী উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিপুল অগ্রগতি সত্ত্বেও তিস্তা ইস্যুর এই স্থবিরতা অনেকের কাছে এক অসম্পূর্ণ অংশীদারিত্বের প্রতীক। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল প্রতিবেশী সম্পর্কের মূল ভিত্তিই হলো পারস্পরিক স্বার্থ ও আস্থার প্রতি সম্মান। ফলে তিস্তা সমস্যার সমাধান না হওয়া সেই আস্থার ভিত্তিকে কেবল দুর্বলই করছে না, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এটি এখন দিল্লির কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে, ভারতের নিজস্ব ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কার্যকারিতাও আজ এই একটি চুক্তির সফলতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। হিমালয়ের হিমবাহ গলন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এমনিতেই হুমকির মুখে। এই বাস্তবতায় যেকোনো একতরফা পদক্ষেপের পরিবর্তে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

তবে এই কারিগরি সমাধানের পথে শুধু রাজনৈতিক জটিলতাই নয়, জনমানসের তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসও একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। উভয় দেশের কিছু মহলে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা এবং ভুল তথ্য প্রচারের কারণে প্রায়শই বাস্তব চিত্রটি জনপরিসরে আড়াল হয়ে যায়। তাই উভয় দেশের তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের উচিত এই ইস্যুকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এনে বৈজ্ঞানিক ও মানবিক আলোকেই বিবেচনা করা।

অবশ্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ভারতের কেন্দ্রে নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা পূর্বের তুলনায় শক্তিশালী হওয়ায় এবং পশ্চিমবঙ্গেও কেন্দ্রের সমমনা রাজনৈতিক শক্তির নীতিগত সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার একটি তাত্ত্বিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অতীতে তিস্তা চুক্তির অন্যতম প্রধান বাধা ছিল পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও রেষারেষি। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আগমন সেই দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। এখন ভারতের কেন্দ্রে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় দুই সরকারের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছানোর এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমান এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সকল ক্ষেত্রে কেন্দ্র এখন তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে বৃহত্তর কৌশলগত গুরুত্ব লাভ করায় দিল্লির কাছে তিস্তা প্রশ্নটি কেবল একটি আঞ্চলিক নদী সমস্যা নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় কৃষি ও সেচের স্বার্থকে উপেক্ষা করে নয়, বরং উভয় দেশের স্বার্থের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল এই চুক্তির সফল বাস্তবায়ন সম্ভব।

তাছাড়া, তিস্তা ইস্যু এখন কেবল দ্বিপাক্ষিক পানি বণ্টনের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের বৃহত্তর ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট বলে যে, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবহার এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে উজান ও ভাটির উভয় দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে এবং কোনো পক্ষ অযৌক্তিক ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।

বাংলাদেশে তিস্তার পানিপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় নদীর তলদেশে পলি জমছে, শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা সংকট দেখা দিচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ায় উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মুখে পড়ছে। আবার একই সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম অঞ্চলের বাস্তব চাহিদাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। এই জটিল সমীকরণের মধ্যেই যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক নতুন মাত্রা, বিশেষ করে তিস্তা ইস্যুতে চীনের আগ্রহ।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীভিত্তিক খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ এবং সেচব্যবস্থার উন্নয়নে চীন যে বিপুল বিনিয়োগ ও কারিগরি আগ্রহ দেখিয়েছে, তা যেমন বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনি তা বেইজিংয়ের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত অংশও বটে। ভারত তিস্তাকে একটি সংবেদনশীল সীমান্তবর্তী নদী বিবেচনা করায় এই প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা স্বভাবতই ভারত-চীন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার এক নতুন ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে, যা তিস্তাকে শুধু পানির বিষয় থেকে সরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনীতির উপাদানে পরিণত করেছে।

এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে উত্তরণের পথটি তাই কেবল ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপের মধ্যে নয়, বরং খাঁটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শনের মধ্যেই নিহিত। ভারতকে তার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং বাংলাদেশকে তার গঠনমূলক ও সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, যেখানে যৌথ নদী কমিশনকে আরও কার্যকর ও সক্রিয় করা জরুরি।

পানি বণ্টনের পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিকূল রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও যদি ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ টিকে থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার তুলনামূলক পরিপক্ব সম্পর্কের আলোকে তিস্তা চুক্তিও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।

একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি পরিমাপ করা হয় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জটিলতম সমস্যাগুলোর ন্যায়সংগত সমাধানের মাধ্যমে। তিস্তা আজ সেই পরীক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। যদি দুই দেশ এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কাটিয়ে একটি ন্যায্য, গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে পারে, তবে তা শুধু দুই দেশের অববাহিকাবাসী কোটি মানুষের ভাগ্যবদলই করবে না, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, পারস্পরিক গভীর আস্থা এবং টেকসই স্থিতিশীলতার এক নতুন ও গৌরবময় দিগন্ত উন্মোচন করবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।  (প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই লেখকের।)