১১:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

করিডোর ইস্যু: রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে গণতন্ত্র কোথায়?

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেকোনো জাতীয় সংকটে সর্বদলীয় বৈঠকের সংস্কৃতি দৃশ্যমান। দেশটির ইতিহাসে এমন বহু নজির আছে যেখানে বিরোধীদলের নেতাদেরও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং বিরোধীদলীয় নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ীকে জাতিসংঘে বিশেষ দূত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। সেই তুলনায় বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন সহযোগিতার পরিবেশ যেন একপ্রকার বিলুপ্তই হয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মায়ানমার-সংলগ্ন রাখাইন রাজ্যে অস্থিরতার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে জাতিসংঘের ‘মানবিক করিডোর’ গঠনের প্রস্তাবটি চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে বলে জানা যাচ্ছে। অথচ, ‘গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক’ প্রভাব ফেলা সম্ভব, এমন একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো—কোনোরূপ জাতীয় আলোচনার আয়োজন না করেই। রাজনৈতিক দলসমূহ, এমনকি সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক বা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়াই এমন এক সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

রাষ্ট্র কখনো কখনো নিজেদের কৌশলগত প্রয়োজনে গোপন বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। এ কথা এখন প্রায় স্বীকৃত যে, খুব শীঘ্রই ভাঙতে চলেছে মায়ানমার রাষ্ট্র। আরাকান আর্মির নেতৃত্বে রাখাইনে প্রতিষ্ঠা হবে নতুন দেশ। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ নতুন প্রতিবেশী পেতে চলেছে, তা প্রায় নিশ্চিত। সেহেতু, আরাকান আর্মির সঙ্গে ন্যূনতম অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বাংলাদেশকে রক্ষা করতেই হবে।

ভারতও নিজেদের ‘কালাদান প্রকল্প’ রক্ষা করতে আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে; এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিতও হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে চাইলে বাংলাদেশও আরাকান আর্মির সঙ্গে বিভিন্ন কৌশলগত সংলাপ ও বোঝাপড়ার পথ খুঁজতে পারতো। কিন্তু তা না করে, জাতিসংঘের সুপারিশ (নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ?) অনুযায়ী, সীমান্তে মানবিক করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এক ধরনের একতরফা উদ্যোগ নিলো বাংলাদেশ। এতে, আরাকান আর্মি লাভবান হবে ঠিকই, কিন্তু আদতে আমাদের অন্যতম সহযোগী রাষ্ট্র চীন কতটা খুশি হবে, তার প্রতিক্রিয়াই বা কেমন হবে; তা আমাদেরকে ভাবতে হবে। পাশাপাশি, এই করিডোরের সুবাদে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসবাদ নতুন উদ্যমে উসকানী দিবে কী না, তাও আমাদের বিবেচনায় রাখতেই হবে।  

এই করিডোরের প্রকৃতি কী? তা কি কেবল সীমান্ত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা সংশ্লিষ্ট দু দেশের অভ্যন্তরে গভীর কোনো লজিস্টিক অপারেশনকে বৈধতা দেবে? জাতিসংঘের কর্মীরা স্বয়ং মিয়ানমারের ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে, নাকি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা সীমান্তরক্ষীরা সেই দায়িত্ব পালন করবে? মিয়ানমারের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতিক্রিয়া কী? আরাকান আর্মি জাতিসংঘকে করিডোর ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিয়েছে কিনা? তারা কি সাহায্যগুলো গ্রহণের পর তা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বিতরণ করবে? এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মানবিক করিডোর অনুমোদনের সিদ্ধান্ত একরকম অপরিণামদর্শিতার নামান্তর।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বহন করছে। এখন রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে করিডোর গঠনের মাধ্যমে নতুন এক জটিলতায় জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ, যার মধ্যে মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সম্ভাবনাও নাকচ করা যায় না। ধারণা করি, এই নিদারুণ ছাড় দেয়ার পুরস্কার হিসেবে মার্কিন অনুগত ডক্টর ইউনুস আরেকটি নোবেল বাগাতে পারেন!

সব মিলিয়ে বলতেই হয়—এমন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যেখানে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে তা এককভাবে নেয়া যেকোনো সরকারের জন্যেই উচিত নয়। এটি সর্বদলীয় আলোচনার মাধ্যমে এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হওয়া জরুরি ছিল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সৌন্দর্য এখানেই—প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতিকে আরও সুসংহত ও যৌক্তিক করা।

লেখক: পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন গবেষক

করিডোর ইস্যু: রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে গণতন্ত্র কোথায়?

প্রকাশ: ১২:৪১:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৫

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেকোনো জাতীয় সংকটে সর্বদলীয় বৈঠকের সংস্কৃতি দৃশ্যমান। দেশটির ইতিহাসে এমন বহু নজির আছে যেখানে বিরোধীদলের নেতাদেরও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং বিরোধীদলীয় নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ীকে জাতিসংঘে বিশেষ দূত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। সেই তুলনায় বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন সহযোগিতার পরিবেশ যেন একপ্রকার বিলুপ্তই হয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মায়ানমার-সংলগ্ন রাখাইন রাজ্যে অস্থিরতার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে জাতিসংঘের ‘মানবিক করিডোর’ গঠনের প্রস্তাবটি চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে বলে জানা যাচ্ছে। অথচ, ‘গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক’ প্রভাব ফেলা সম্ভব, এমন একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো—কোনোরূপ জাতীয় আলোচনার আয়োজন না করেই। রাজনৈতিক দলসমূহ, এমনকি সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক বা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়াই এমন এক সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

রাষ্ট্র কখনো কখনো নিজেদের কৌশলগত প্রয়োজনে গোপন বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। এ কথা এখন প্রায় স্বীকৃত যে, খুব শীঘ্রই ভাঙতে চলেছে মায়ানমার রাষ্ট্র। আরাকান আর্মির নেতৃত্বে রাখাইনে প্রতিষ্ঠা হবে নতুন দেশ। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ নতুন প্রতিবেশী পেতে চলেছে, তা প্রায় নিশ্চিত। সেহেতু, আরাকান আর্মির সঙ্গে ন্যূনতম অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বাংলাদেশকে রক্ষা করতেই হবে।

ভারতও নিজেদের ‘কালাদান প্রকল্প’ রক্ষা করতে আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে; এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিতও হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে চাইলে বাংলাদেশও আরাকান আর্মির সঙ্গে বিভিন্ন কৌশলগত সংলাপ ও বোঝাপড়ার পথ খুঁজতে পারতো। কিন্তু তা না করে, জাতিসংঘের সুপারিশ (নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ?) অনুযায়ী, সীমান্তে মানবিক করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এক ধরনের একতরফা উদ্যোগ নিলো বাংলাদেশ। এতে, আরাকান আর্মি লাভবান হবে ঠিকই, কিন্তু আদতে আমাদের অন্যতম সহযোগী রাষ্ট্র চীন কতটা খুশি হবে, তার প্রতিক্রিয়াই বা কেমন হবে; তা আমাদেরকে ভাবতে হবে। পাশাপাশি, এই করিডোরের সুবাদে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসবাদ নতুন উদ্যমে উসকানী দিবে কী না, তাও আমাদের বিবেচনায় রাখতেই হবে।  

এই করিডোরের প্রকৃতি কী? তা কি কেবল সীমান্ত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা সংশ্লিষ্ট দু দেশের অভ্যন্তরে গভীর কোনো লজিস্টিক অপারেশনকে বৈধতা দেবে? জাতিসংঘের কর্মীরা স্বয়ং মিয়ানমারের ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে, নাকি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা সীমান্তরক্ষীরা সেই দায়িত্ব পালন করবে? মিয়ানমারের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতিক্রিয়া কী? আরাকান আর্মি জাতিসংঘকে করিডোর ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিয়েছে কিনা? তারা কি সাহায্যগুলো গ্রহণের পর তা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বিতরণ করবে? এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মানবিক করিডোর অনুমোদনের সিদ্ধান্ত একরকম অপরিণামদর্শিতার নামান্তর।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বহন করছে। এখন রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে করিডোর গঠনের মাধ্যমে নতুন এক জটিলতায় জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ, যার মধ্যে মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সম্ভাবনাও নাকচ করা যায় না। ধারণা করি, এই নিদারুণ ছাড় দেয়ার পুরস্কার হিসেবে মার্কিন অনুগত ডক্টর ইউনুস আরেকটি নোবেল বাগাতে পারেন!

সব মিলিয়ে বলতেই হয়—এমন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যেখানে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে তা এককভাবে নেয়া যেকোনো সরকারের জন্যেই উচিত নয়। এটি সর্বদলীয় আলোচনার মাধ্যমে এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হওয়া জরুরি ছিল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সৌন্দর্য এখানেই—প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতিকে আরও সুসংহত ও যৌক্তিক করা।

লেখক: পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন গবেষক