১২:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং যাত্রা ও সমকালীন ভূরাজনীতি

তারেক রহমান - শি জিনপিং

মোঃ নাঈম আলী: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের এক জটিল ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশীয় অঞ্চলে চীনের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান, প্রতিবেশি ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব ও আধিপত্য ধরে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা এবং ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এই ভূখণ্ডকে এক নতুন এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

এই ত্রিভুজাকার ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক যাত্রা নয়; বরং এটি উত্তর-নির্বাচনী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির সুনির্দিষ্ট গতিপথ, বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক কৌশল এবং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার ডাভোস সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং পরবর্তীতে বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটিকে ঢাকার নতুন সরকারের প্রথম বৃহৎ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের দেওয়া তথ্যমতে, এই সফরে প্রায় ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ও স্পর্শকাতর তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো ভূকৌশলগত বিষয়গুলোও এই সফরের আলোচ্যসূচিতে স্থান পেয়েছে, যা ঢাকার নতুন প্রশাসনের কূটনৈতিক পরিপক্কতার একটি বড় পরীক্ষা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী (রিয়েলিস্ট) তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রসমূহ সর্বদা তার আদর্শিক বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার চেয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার অবস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বেইজিংয়ের এই দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপন করা চীনের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক, বাস্তবসম্মত এবং পরিপক্ক কূটনৈতিক চাল। এটি স্পষ্ট করে দেয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল বা শাসনব্যবস্থার রূপান্তর ঘটলেও বৃহৎ শক্তিগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলীয় সম্পর্কের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

গত এক দশকে চীন তার বৈশ্বিক ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) -এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়াকে ভূকৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিসি), শ্রীলঙ্কার কৌশলগত হাম্বানটোটা বন্দর কিংবা নেপালের তিব্বত-কেন্দ্রিক অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে থাকা বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বেইজিংয়ের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত মূল্যবান।

ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ যেহেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং এর রয়েছে সরাসরি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশাধিকার, তাই একটি স্থিতিশীল ও বিকাশমান অর্থনীতি হিসেবে ঢাকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর চীনের এই গভীর আগ্রহকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের আমন্ত্রণ এবং দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের এই তাগিদ মূলত বেইজিংয়ের সেই দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরই এক বাস্তব প্রতিফলন।

তবে বাংলাদেশের এই বেইজিং যাত্রাকে সবচেয়ে নিবিড় ও একধরনের কৌশলগত অস্বস্তির সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত ঐতিহ্যগতভাবেই নিজেকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার এবং এই অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল সাধারণ প্রতিবেশিসুলভ নয়; বরং এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা, শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর ভূকৌশলগত স্থিতিশীলতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি করিডোর এবং অভিন্ন নদী অববাহিকার যৌথ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ভারতের ঠিক দোরগোড়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জীবনরেখা তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অর্থায়ন কিংবা কারিগরি অংশগ্রহণ নয়াদিল্লির কৌশলগত নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও ঢাকা বারবার স্পষ্ট করে বলেছে তারা কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির সামরিক বা ভূরাজনৈতিক জোটের অংশ হতে চায় না, তথাপি ভারত-চীন দ্বৈরথের বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ এখন দিল্লির নীতিগত টেবিলে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। একই সাথে ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মনস্তাত্ত্বিক চাপকেও ঢাকার নীতি-নির্ধারকদের হিসেবে রাখতে হচ্ছে।

এই ত্রিমুখী পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘শক্তির ভারসাম্য’ এবং ঝুঁকি হ্রাসের ‘হেজিং স্ট্র্যাটেজি’র আলোকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বাংলাদেশের মতো মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলো সাধারণত কোনো একক পরাশক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী ও বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বজায় রাখার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ডলার সংকটের মুখে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগ, শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা ও কারিগরি সহযোগিতা যেমন অত্যন্ত প্রয়োজন, তেমনি ভৌগোলিক বাস্তবতা, গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ এবং টেকসই আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার সংকট, নেপালের দুই প্রতিবেশির মাঝখানে টিকে থাকার লড়াই কিংবা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত রূপান্তরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় অনুসঙ্গ হতে পারে। কোনো একক শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারে, যা পরিহার করে চলাই শ্রেয়।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি। কোনো আন্তর্জাতিক সফরের প্রকৃত সাফল্য কেবল কতগুলো চুক্তি সই হলো, কতগুলো দ্বিপাক্ষিক যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হলো কিংবা কতগুলো চমৎকার ছবি তোলা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে আমরা বেইজিং থেকে কতটা বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারলাম, কতটা প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করতে পারলাম, দেশের তরুণদের জন্য কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং সর্বোপরি কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা গেল, তার ওপর।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বেইজিং সফর মূলত দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ এখন আর আঞ্চলিক রাজনীতির কোনো প্রান্তিক বা নিষ্ক্রিয় রাষ্ট্র নয়, বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গতিশীল ও অনিবার্য কেন্দ্রবিন্দু। ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেবে, তা যেমন নির্ভর করছে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার তীব্রতার ওপর, ঠিক তেমনি নির্ভর করছে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো কতটা দক্ষতার সাথে, আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে তার ওপর।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই লেখকের।)

ট্যাগ:

প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং যাত্রা ও সমকালীন ভূরাজনীতি

প্রকাশ: ০৭:০৭:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

মোঃ নাঈম আলী: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের এক জটিল ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশীয় অঞ্চলে চীনের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান, প্রতিবেশি ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব ও আধিপত্য ধরে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা এবং ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এই ভূখণ্ডকে এক নতুন এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

এই ত্রিভুজাকার ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক যাত্রা নয়; বরং এটি উত্তর-নির্বাচনী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির সুনির্দিষ্ট গতিপথ, বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক কৌশল এবং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার ডাভোস সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং পরবর্তীতে বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটিকে ঢাকার নতুন সরকারের প্রথম বৃহৎ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের দেওয়া তথ্যমতে, এই সফরে প্রায় ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ও স্পর্শকাতর তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো ভূকৌশলগত বিষয়গুলোও এই সফরের আলোচ্যসূচিতে স্থান পেয়েছে, যা ঢাকার নতুন প্রশাসনের কূটনৈতিক পরিপক্কতার একটি বড় পরীক্ষা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী (রিয়েলিস্ট) তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রসমূহ সর্বদা তার আদর্শিক বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার চেয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার অবস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বেইজিংয়ের এই দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপন করা চীনের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক, বাস্তবসম্মত এবং পরিপক্ক কূটনৈতিক চাল। এটি স্পষ্ট করে দেয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল বা শাসনব্যবস্থার রূপান্তর ঘটলেও বৃহৎ শক্তিগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলীয় সম্পর্কের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

গত এক দশকে চীন তার বৈশ্বিক ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) -এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়াকে ভূকৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিসি), শ্রীলঙ্কার কৌশলগত হাম্বানটোটা বন্দর কিংবা নেপালের তিব্বত-কেন্দ্রিক অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে থাকা বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বেইজিংয়ের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত মূল্যবান।

ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ যেহেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং এর রয়েছে সরাসরি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশাধিকার, তাই একটি স্থিতিশীল ও বিকাশমান অর্থনীতি হিসেবে ঢাকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর চীনের এই গভীর আগ্রহকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের আমন্ত্রণ এবং দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের এই তাগিদ মূলত বেইজিংয়ের সেই দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরই এক বাস্তব প্রতিফলন।

তবে বাংলাদেশের এই বেইজিং যাত্রাকে সবচেয়ে নিবিড় ও একধরনের কৌশলগত অস্বস্তির সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত ঐতিহ্যগতভাবেই নিজেকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার এবং এই অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল সাধারণ প্রতিবেশিসুলভ নয়; বরং এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা, শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর ভূকৌশলগত স্থিতিশীলতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি করিডোর এবং অভিন্ন নদী অববাহিকার যৌথ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ভারতের ঠিক দোরগোড়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জীবনরেখা তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অর্থায়ন কিংবা কারিগরি অংশগ্রহণ নয়াদিল্লির কৌশলগত নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও ঢাকা বারবার স্পষ্ট করে বলেছে তারা কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির সামরিক বা ভূরাজনৈতিক জোটের অংশ হতে চায় না, তথাপি ভারত-চীন দ্বৈরথের বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ এখন দিল্লির নীতিগত টেবিলে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। একই সাথে ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মনস্তাত্ত্বিক চাপকেও ঢাকার নীতি-নির্ধারকদের হিসেবে রাখতে হচ্ছে।

এই ত্রিমুখী পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘শক্তির ভারসাম্য’ এবং ঝুঁকি হ্রাসের ‘হেজিং স্ট্র্যাটেজি’র আলোকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বাংলাদেশের মতো মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলো সাধারণত কোনো একক পরাশক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী ও বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বজায় রাখার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ডলার সংকটের মুখে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগ, শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা ও কারিগরি সহযোগিতা যেমন অত্যন্ত প্রয়োজন, তেমনি ভৌগোলিক বাস্তবতা, গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ এবং টেকসই আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার সংকট, নেপালের দুই প্রতিবেশির মাঝখানে টিকে থাকার লড়াই কিংবা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত রূপান্তরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় অনুসঙ্গ হতে পারে। কোনো একক শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারে, যা পরিহার করে চলাই শ্রেয়।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি। কোনো আন্তর্জাতিক সফরের প্রকৃত সাফল্য কেবল কতগুলো চুক্তি সই হলো, কতগুলো দ্বিপাক্ষিক যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হলো কিংবা কতগুলো চমৎকার ছবি তোলা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে আমরা বেইজিং থেকে কতটা বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারলাম, কতটা প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করতে পারলাম, দেশের তরুণদের জন্য কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং সর্বোপরি কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা গেল, তার ওপর।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বেইজিং সফর মূলত দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ এখন আর আঞ্চলিক রাজনীতির কোনো প্রান্তিক বা নিষ্ক্রিয় রাষ্ট্র নয়, বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গতিশীল ও অনিবার্য কেন্দ্রবিন্দু। ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেবে, তা যেমন নির্ভর করছে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার তীব্রতার ওপর, ঠিক তেমনি নির্ভর করছে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো কতটা দক্ষতার সাথে, আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে তার ওপর।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই লেখকের।)