১২:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আস্থার সংকটে দক্ষিণ এশিয়া: অভিন্ন জল, ভিন্ন রাজনীতি

লেখক

সুবর্ণা আক্তার: পানি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, জননিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান এবং বিতর্কিত নিয়ামক। প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের নিবিড় আবাসস্থল এই অঞ্চলটি প্রাকৃতিকভাবেই সীমান্ত অতিক্রমকারী এক বিশাল নদী ব্যবস্থার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং তিস্তাসহ হিমালয় থেকে উৎপন্ন হওয়া অসংখ্য আন্তঃসীমান্ত নদী এই অঞ্চলের ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, চীন এবং আফগানিস্তানকে একটি অভিন্ন পরিবেশগত সূত্রে সংযুক্ত করেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় পানি কেবল একটি অতিপ্রয়োজনীয় পরিবেশগত বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি মূলত এক সংবেদনশীল রাজনৈতিক চালিকাশক্তি, যা রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে।

এই অঞ্চলের পানি রাজনীতির মূল সংকটটি লুকিয়ে আছে উজান ও ভাটির দেশগুলোর মধ্যকার ভৌগোলিক অসমতার মধ্যে। অধিকাংশ প্রধান নদীর উৎপত্তি চীন, ভারত বা নেপালের মতো উজানের দেশগুলোতে হওয়ায় এবং সেগুলো বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো ভাটির দেশের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় এক জটিল একমুখী নির্ভরতার সৃষ্টি হয়েছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে উজানের দেশগুলো যখন একতরফাভাবে বাঁধ, ব্যারাজ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন ভাটির দেশগুলো তীব্র শুষ্ক মৌসুমে চরম পানি সংকট, আবার বর্ষায় কৃত্রিম বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।

অবশ্য এই বৈরী পরিবেশেও দক্ষিণ এশিয়ায় পানি সহযোগিতার কিছু উজ্জ্বল ঐতিহাসিক নজির রয়েছে, যার অন্যতম উদাহরণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সিন্ধু নদী ব্যবস্থা। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ বিশ্বে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার অন্যতম সফল একটি দলিল হিসেবে বিবেচিত, যা তীব্র রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও গত সাড়ে ছয়ের দশক ধরে টিকে আছে।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (জিবিএম) অববাহিকায় ভারত ও বাংলাদেশের পানি কূটনীতি এক নতুন ও স্পর্শকাতর বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ফারাক্কা পয়েন্টে শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টনের একটি নির্দিষ্ট সূত্র নির্ধারণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা প্রশমন করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে এই ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে এর নবায়ন এখন ঢাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কূটনৈতিক এজেন্ডা।

বাংলাদেশ এখন একটি বৈজ্ঞানিক, ন্যায্য ও জলবায়ু-সহনশীল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দাবিদার, পক্ষান্তরে নয়াদিল্লিকে তার নিজস্ব ফেডারেল কাঠামোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অববাহিকাভুক্ত রাজ্যগুলোর দাবিকে সমন্বয় করতে হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ন্যায়ভিত্তিক দাবির বিপরীতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে উজান থেকে পানি প্রত্যাহারের এই রূঢ় বাস্তবতার বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনাতেও উঠে এসেছে, যেখানে প্রাকৃতিক কারণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি উজানে নির্মিত বিভিন্ন অবকাঠামোকে ভাটির অববাহিকায় পানি হ্রাসের জন্য দায়ী করা হয়েছে।

শুষ্ক মৌসুমে এই পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার বহুমাত্রিক প্রভাব বাংলাদেশের জন্য এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ মাত্রায় লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ঘটছে, ব্যাহত হচ্ছে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতা, এবং ধ্বংস হচ্ছে মৎস্যসম্পদ। ফলশ্রুতিতে কৃষি ও মৎস্যনির্ভর কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা আজ চরম ঝুঁকির সম্মুখীন, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার ওপর।

গঙ্গা চুক্তির এই নবায়ন সংকটের সমান্তরালে তিস্তা নদীর অববাহিকাভিত্তিক স্থায়ী চুক্তিটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে রংপুরসহ বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চলের জীবন রক্ষাকারী সেচ ব্যবস্থার জন্য তিস্তার পানির ন্যায্য অংশ পাওয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আইনসম্মত অধিকার হলেও পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও কৃষি-সংক্রান্ত আপত্তির কারণে এই দীর্ঘস্থায়ী জটটি খুলছে না, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক পানি সহযোগিতার পথে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা।

এই জটিলতাকে আরও বহুমাত্রিক ও স্পর্শকাতর করে তুলেছে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবস্থা। তিব্বতীয় মালভূমি থেকে উৎপন্ন এই নদের অববাহিকায় কোনো সুনির্দিষ্ট বহুপাক্ষিক চুক্তি না থাকায়, উজানে চীনের বাঁধ নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্য আদান-প্রদানে স্বচ্ছতার অভাব ভাটির দেশগুলোর জন্য এক ধরনের গভীর কৌশলগত অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এই পানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও বেশি অনিয়মিত ও তীব্র করে তুলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে, যার ফলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গিয়ে খরা ও বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রাকৃতিক রূপান্তরের কারণে অতীতে নদীর পানির পরিমাপের (হিস্টোরিক্যাল ফ্লো ডাটা) ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া চুক্তিগুলোর কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা আজ প্রশ্নের মুখে।

এছাড়াও, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং শিল্পায়নের ফলে কৃষি ও গৃহস্থালি খাতে পানির প্রতিযোগিতামূলক চাহিদা নদীগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অথচ এই সংকটের বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক নদী ব্যবস্থাপনা এখনও অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন এবং মূলত দ্বিপাক্ষিক ও নির্দিষ্ট নদীভিত্তিক; যা সমগ্র অববাহিকাভিত্তিক (বেসিন-ওয়াইড) আধুনিক ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

বলা বাহুল্য, এই অঞ্চলের টেকসই ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে দেশগুলোর স্বল্পমেয়াদি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সম অংশীদারিত্বের কৌশল গ্রহণ করার ওপর। তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা, যৌথ জলবিদ্যাগত পর্যবেক্ষণ উন্নত করা এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নদীগুলোকে বিচ্ছিন্ন জাতীয় সম্পদ হিসেবে না দেখে অভিন্ন পরিবেশগত একক হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।

দক্ষিণ এশিয়ার পানি কূটনীতি আজ কেবল পানি ভাগাভাগির সমীকরণ নয়, এটি মূলত এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর শাসনব্যবস্থা, পারস্পরিক গভীর আস্থা এবং টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছার এক মহতী পরীক্ষা, যেখানে পানিকে বিভাজনের হাতিয়ার না বানিয়ে আঞ্চলিক সংযোগ ও সহযোগিতার সেতুবন্ধনে রূপ দেওয়াই হবে একমাত্র বিচক্ষণতা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই লেখকের।)

 

ট্যাগ:

আস্থার সংকটে দক্ষিণ এশিয়া: অভিন্ন জল, ভিন্ন রাজনীতি

প্রকাশ: ০৬:২৮:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

সুবর্ণা আক্তার: পানি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, জননিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান এবং বিতর্কিত নিয়ামক। প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের নিবিড় আবাসস্থল এই অঞ্চলটি প্রাকৃতিকভাবেই সীমান্ত অতিক্রমকারী এক বিশাল নদী ব্যবস্থার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং তিস্তাসহ হিমালয় থেকে উৎপন্ন হওয়া অসংখ্য আন্তঃসীমান্ত নদী এই অঞ্চলের ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, চীন এবং আফগানিস্তানকে একটি অভিন্ন পরিবেশগত সূত্রে সংযুক্ত করেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় পানি কেবল একটি অতিপ্রয়োজনীয় পরিবেশগত বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি মূলত এক সংবেদনশীল রাজনৈতিক চালিকাশক্তি, যা রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে।

এই অঞ্চলের পানি রাজনীতির মূল সংকটটি লুকিয়ে আছে উজান ও ভাটির দেশগুলোর মধ্যকার ভৌগোলিক অসমতার মধ্যে। অধিকাংশ প্রধান নদীর উৎপত্তি চীন, ভারত বা নেপালের মতো উজানের দেশগুলোতে হওয়ায় এবং সেগুলো বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো ভাটির দেশের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় এক জটিল একমুখী নির্ভরতার সৃষ্টি হয়েছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে উজানের দেশগুলো যখন একতরফাভাবে বাঁধ, ব্যারাজ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন ভাটির দেশগুলো তীব্র শুষ্ক মৌসুমে চরম পানি সংকট, আবার বর্ষায় কৃত্রিম বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।

অবশ্য এই বৈরী পরিবেশেও দক্ষিণ এশিয়ায় পানি সহযোগিতার কিছু উজ্জ্বল ঐতিহাসিক নজির রয়েছে, যার অন্যতম উদাহরণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সিন্ধু নদী ব্যবস্থা। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ বিশ্বে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার অন্যতম সফল একটি দলিল হিসেবে বিবেচিত, যা তীব্র রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও গত সাড়ে ছয়ের দশক ধরে টিকে আছে।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (জিবিএম) অববাহিকায় ভারত ও বাংলাদেশের পানি কূটনীতি এক নতুন ও স্পর্শকাতর বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ফারাক্কা পয়েন্টে শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টনের একটি নির্দিষ্ট সূত্র নির্ধারণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা প্রশমন করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে এই ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে এর নবায়ন এখন ঢাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কূটনৈতিক এজেন্ডা।

বাংলাদেশ এখন একটি বৈজ্ঞানিক, ন্যায্য ও জলবায়ু-সহনশীল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দাবিদার, পক্ষান্তরে নয়াদিল্লিকে তার নিজস্ব ফেডারেল কাঠামোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অববাহিকাভুক্ত রাজ্যগুলোর দাবিকে সমন্বয় করতে হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ন্যায়ভিত্তিক দাবির বিপরীতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে উজান থেকে পানি প্রত্যাহারের এই রূঢ় বাস্তবতার বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনাতেও উঠে এসেছে, যেখানে প্রাকৃতিক কারণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি উজানে নির্মিত বিভিন্ন অবকাঠামোকে ভাটির অববাহিকায় পানি হ্রাসের জন্য দায়ী করা হয়েছে।

শুষ্ক মৌসুমে এই পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার বহুমাত্রিক প্রভাব বাংলাদেশের জন্য এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ মাত্রায় লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ঘটছে, ব্যাহত হচ্ছে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতা, এবং ধ্বংস হচ্ছে মৎস্যসম্পদ। ফলশ্রুতিতে কৃষি ও মৎস্যনির্ভর কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা আজ চরম ঝুঁকির সম্মুখীন, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার ওপর।

গঙ্গা চুক্তির এই নবায়ন সংকটের সমান্তরালে তিস্তা নদীর অববাহিকাভিত্তিক স্থায়ী চুক্তিটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে রংপুরসহ বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চলের জীবন রক্ষাকারী সেচ ব্যবস্থার জন্য তিস্তার পানির ন্যায্য অংশ পাওয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আইনসম্মত অধিকার হলেও পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও কৃষি-সংক্রান্ত আপত্তির কারণে এই দীর্ঘস্থায়ী জটটি খুলছে না, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক পানি সহযোগিতার পথে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা।

এই জটিলতাকে আরও বহুমাত্রিক ও স্পর্শকাতর করে তুলেছে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবস্থা। তিব্বতীয় মালভূমি থেকে উৎপন্ন এই নদের অববাহিকায় কোনো সুনির্দিষ্ট বহুপাক্ষিক চুক্তি না থাকায়, উজানে চীনের বাঁধ নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্য আদান-প্রদানে স্বচ্ছতার অভাব ভাটির দেশগুলোর জন্য এক ধরনের গভীর কৌশলগত অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এই পানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও বেশি অনিয়মিত ও তীব্র করে তুলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে, যার ফলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গিয়ে খরা ও বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রাকৃতিক রূপান্তরের কারণে অতীতে নদীর পানির পরিমাপের (হিস্টোরিক্যাল ফ্লো ডাটা) ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া চুক্তিগুলোর কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা আজ প্রশ্নের মুখে।

এছাড়াও, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং শিল্পায়নের ফলে কৃষি ও গৃহস্থালি খাতে পানির প্রতিযোগিতামূলক চাহিদা নদীগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অথচ এই সংকটের বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক নদী ব্যবস্থাপনা এখনও অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন এবং মূলত দ্বিপাক্ষিক ও নির্দিষ্ট নদীভিত্তিক; যা সমগ্র অববাহিকাভিত্তিক (বেসিন-ওয়াইড) আধুনিক ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

বলা বাহুল্য, এই অঞ্চলের টেকসই ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে দেশগুলোর স্বল্পমেয়াদি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সম অংশীদারিত্বের কৌশল গ্রহণ করার ওপর। তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা, যৌথ জলবিদ্যাগত পর্যবেক্ষণ উন্নত করা এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নদীগুলোকে বিচ্ছিন্ন জাতীয় সম্পদ হিসেবে না দেখে অভিন্ন পরিবেশগত একক হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।

দক্ষিণ এশিয়ার পানি কূটনীতি আজ কেবল পানি ভাগাভাগির সমীকরণ নয়, এটি মূলত এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর শাসনব্যবস্থা, পারস্পরিক গভীর আস্থা এবং টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছার এক মহতী পরীক্ষা, যেখানে পানিকে বিভাজনের হাতিয়ার না বানিয়ে আঞ্চলিক সংযোগ ও সহযোগিতার সেতুবন্ধনে রূপ দেওয়াই হবে একমাত্র বিচক্ষণতা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই লেখকের।)