০৮:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ছোটদের গল্পলিখন

চম্পার শেষ বিকেল

রুবাইয়া তাসনিন রুহি: রূপপুর গ্রামের ছোট্ট একটি মেয়ে, নাম তার চম্পা; চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলার প্রতিই তার আগ্রহ বেশি। পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কানামাছি, পুতুল খেলা আর দড়ি লাফানো নিয়ে সে সারাক্ষণ মেতে থাকে। কখনো আবার নদীর তীরে বালু দিয়ে ঘর বানায়। এভাবেই আনন্দে কাটছিল তার ছোট্ট জীবন।

একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল চম্পা। খেলার ফাঁকে একটি মশা তাকে কামড় দেয়। বিষয়টি সে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। প্রতিদিনের মতো স্কুলে গিয়ে ক্লাস করল, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করল। স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরে সে বুঝতে পারল, তার শরীরটা ভালো লাগছে না। ধীরে ধীরে শরীরে ব্যথা শুরু হলো, সঙ্গে এলো প্রচণ্ড জ্বর।

চম্পার শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটেরও বেশি হয়ে গেল। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তার মা-বাবা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁরা তাকে গ্রামের এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেন। চিকিৎসক জ্বরের জন্য ওষুধ দিলেন এবং দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।

কিন্তু চম্পার মা-বাবা ছিলেন দরিদ্র। সংসার চালাতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হতো। হাসপাতালে যাওয়া, থাকা এবং চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, তা ভেবে তাঁরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, পরদিন টাকা জোগাড় করে চম্পাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।

বাড়িতে ফিরে মা যখন চম্পাকে ওষুধ খেতে দিলেন, সে ওষুধ খাওয়ার ভান করে তা ফেলে দিল। তার মনে হলো, ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে গেলে আবার স্কুলে যেতে হবে! তাই সে ওষুধ খেতে চাইল না। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, তার এই ছোট্ট অবহেলা কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

পরদিন চম্পাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানালেন, চম্পার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। তাঁরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথা শুনে চম্পা মনে মনে একটু খুশিই হলো। তার মনে হলো, তাহলে আর কিছুদিন স্কুলে যেতে হবে না। কিন্তু সে জানত না, তার অসুখ কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

চম্পার বাবা অসহায় কণ্ঠে চিকিৎসককে বললেন, “স্যার, আমরা গরীব মানুষ। দিন এনে দিন খাই। হাসপাতালে থাকলে সংসার চলবে কীভাবে?”

চিকিৎসক তাঁদের বুঝিয়ে বললেন, চম্পার অবস্থা বিবেচনায় নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ খুব জরুরি। শেষ পর্যন্ত তাঁরা একদিন মেয়েকে হাসপাতালে রাখলেন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ নিয়ে চম্পাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনলেন। চিকিৎসক তাকে পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শও দিলেন।

কিন্তু বাড়িতে ফিরে চম্পা ঠিকমতো ওষুধ খেতে চাইত না। মা যখন তাকে ওষুধ ও তরল খাবার খেতে দিতেন, সে অল্প একটু খেয়েই বমি করে ফেলত। এভাবে কয়েক দিন না যেতেই তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে লাগল।

একদিন বিকেলবেলা হঠাৎ চম্পার প্রচণ্ড পেটব্যথা শুরু হলো। বারবার বমি করতে লাগল সে। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তার মা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে তিনি বাড়ির বাইরে গেলেন। কিন্তু তাঁদের বাড়ির কাছাকাছি কোনো ওষুধের দোকান ছিল না। দোকানটি ছিল অনেক দূরে।

এদিকে চম্পা বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। তার শরীরে আর যেন শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। একসময় সে মাকে ডাকতে চাইল, কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। হঠাৎ তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর মা ফিরে এসে দেখলেন, তাঁর আদরের মেয়েটি আর বেঁচে নেই। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে গেল। চম্পার বাবা তখন অন্যের জমিতে কাজ করছিলেন। মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে তিনিও ছুটে এলেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা-বাবা দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাঁদের বুকফাটা কান্নায় চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।

চম্পার ছোট্ট জীবনটি এভাবেই অকালে ঝরে গেল। একটু সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ হয়তো তার জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারত।

লেখক: শিক্ষার্থী, চতুর্থ শ্রেণি। ঠিকানা: রূপনগর আবাসিক এলাকা, মিরপুর-২, ঢাকা-১২১৬। পিতা: মোঃ আলমগীর হোসেন

ট্যাগ:

ছোটদের গল্পলিখন

চম্পার শেষ বিকেল

প্রকাশ: ১১:২৯:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

রুবাইয়া তাসনিন রুহি: রূপপুর গ্রামের ছোট্ট একটি মেয়ে, নাম তার চম্পা; চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলার প্রতিই তার আগ্রহ বেশি। পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কানামাছি, পুতুল খেলা আর দড়ি লাফানো নিয়ে সে সারাক্ষণ মেতে থাকে। কখনো আবার নদীর তীরে বালু দিয়ে ঘর বানায়। এভাবেই আনন্দে কাটছিল তার ছোট্ট জীবন।

একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল চম্পা। খেলার ফাঁকে একটি মশা তাকে কামড় দেয়। বিষয়টি সে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। প্রতিদিনের মতো স্কুলে গিয়ে ক্লাস করল, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করল। স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরে সে বুঝতে পারল, তার শরীরটা ভালো লাগছে না। ধীরে ধীরে শরীরে ব্যথা শুরু হলো, সঙ্গে এলো প্রচণ্ড জ্বর।

চম্পার শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটেরও বেশি হয়ে গেল। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তার মা-বাবা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁরা তাকে গ্রামের এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেন। চিকিৎসক জ্বরের জন্য ওষুধ দিলেন এবং দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।

কিন্তু চম্পার মা-বাবা ছিলেন দরিদ্র। সংসার চালাতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হতো। হাসপাতালে যাওয়া, থাকা এবং চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, তা ভেবে তাঁরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, পরদিন টাকা জোগাড় করে চম্পাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।

বাড়িতে ফিরে মা যখন চম্পাকে ওষুধ খেতে দিলেন, সে ওষুধ খাওয়ার ভান করে তা ফেলে দিল। তার মনে হলো, ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে গেলে আবার স্কুলে যেতে হবে! তাই সে ওষুধ খেতে চাইল না। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, তার এই ছোট্ট অবহেলা কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

পরদিন চম্পাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানালেন, চম্পার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। তাঁরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথা শুনে চম্পা মনে মনে একটু খুশিই হলো। তার মনে হলো, তাহলে আর কিছুদিন স্কুলে যেতে হবে না। কিন্তু সে জানত না, তার অসুখ কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

চম্পার বাবা অসহায় কণ্ঠে চিকিৎসককে বললেন, “স্যার, আমরা গরীব মানুষ। দিন এনে দিন খাই। হাসপাতালে থাকলে সংসার চলবে কীভাবে?”

চিকিৎসক তাঁদের বুঝিয়ে বললেন, চম্পার অবস্থা বিবেচনায় নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ খুব জরুরি। শেষ পর্যন্ত তাঁরা একদিন মেয়েকে হাসপাতালে রাখলেন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ নিয়ে চম্পাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনলেন। চিকিৎসক তাকে পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শও দিলেন।

কিন্তু বাড়িতে ফিরে চম্পা ঠিকমতো ওষুধ খেতে চাইত না। মা যখন তাকে ওষুধ ও তরল খাবার খেতে দিতেন, সে অল্প একটু খেয়েই বমি করে ফেলত। এভাবে কয়েক দিন না যেতেই তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে লাগল।

একদিন বিকেলবেলা হঠাৎ চম্পার প্রচণ্ড পেটব্যথা শুরু হলো। বারবার বমি করতে লাগল সে। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তার মা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে তিনি বাড়ির বাইরে গেলেন। কিন্তু তাঁদের বাড়ির কাছাকাছি কোনো ওষুধের দোকান ছিল না। দোকানটি ছিল অনেক দূরে।

এদিকে চম্পা বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। তার শরীরে আর যেন শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। একসময় সে মাকে ডাকতে চাইল, কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। হঠাৎ তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর মা ফিরে এসে দেখলেন, তাঁর আদরের মেয়েটি আর বেঁচে নেই। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে গেল। চম্পার বাবা তখন অন্যের জমিতে কাজ করছিলেন। মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে তিনিও ছুটে এলেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা-বাবা দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাঁদের বুকফাটা কান্নায় চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।

চম্পার ছোট্ট জীবনটি এভাবেই অকালে ঝরে গেল। একটু সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ হয়তো তার জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারত।

লেখক: শিক্ষার্থী, চতুর্থ শ্রেণি। ঠিকানা: রূপনগর আবাসিক এলাকা, মিরপুর-২, ঢাকা-১২১৬। পিতা: মোঃ আলমগীর হোসেন