০৭:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছয় মাসে ৭০০ নাগরিককে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী: জাতিসংঘ

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গত বছরের নির্বাচনী সময়কালজুড়ে ৭শ’র বেশি বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে অন্তত ৭০২ জন নিহত হওয়ার তথ্য বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ শিশু রয়েছে।

প্রতিবেদনটি এমন এক সময়কালকে ঘিরে প্রকাশ করা হয়েছে, যখন সামরিক সরকার নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়। তবে প্রধান বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়ায় এ নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে প্রহসন হিসেবে আখ্যায়িত করে অনেকে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটির লাখো মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে গেছে।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এখনও দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর বিমান হামলাই ছিল ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় কারণ। দেশটির সাগাইং অঞ্চলকে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে অন্তত ১৯১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬০ জন নারী ও ৩০ শিশু।

গত অক্টোবরে সাগাইংয়ের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্কুলের সামনে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর গোলাবর্ষণের ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হন। নিহতদের মধ্যে চার শিশু ছিল। এছাড়া ডিসেম্বর মাসে সাগাইংয়ের তাবায়িন এলাকায় একটি চায়ের দোকানে বিমান হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত এবং আরও ২০ জন আহত হন। হামলার সময় সেখানে লোকজন ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য জড়ো হয়েছিলেন।

প্রতিবেদনটিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, তারা আরাকান আর্মির জোরপূর্বক নিয়োগ, হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেফতার এবং যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, ‘মিয়ানমারের জনগণ সামরিক বাহিনীর হাতে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার। এখন মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাদের ভুলে যেতে বসেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ের সুরক্ষা কার্যক্রমে অর্থায়ন অনেক মানুষের জন্য একমাত্র ভরসা ছিল। কিন্তু সেই সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের দুর্দশা আরও গভীর হচ্ছে।’

২০২১ সালে সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে এবং দেশটির তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি’কে কারাবন্দি করে। পরবর্তীতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো কিছু এলাকায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলেও সাম্প্রতিক বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী আবারও বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা জেনারেল মিন অং হ্লাইং দেশটির প্রেসিডেন্ট হন। তবে বিরোধী দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের বড় অংশ নির্বাচনের বাইরে থাকায় নির্বাচনটি আগে থেকেই একতরফা বলে বিবেচিত হচ্ছিল। সংসদে সামরিকপন্থি সদস্যদের প্রাধান্য রয়েছে এবং সংবিধান অনুযায়ী এক-চতুর্থাংশ আসন সরাসরি সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। বাকি আসনের মধ্যে সামরিক সমর্থিত ইউএসডিপি প্রায় ৮০ শতাংশ আসন জয় করেছে। সমালোচকদের মতে, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই সামরিক সরকারের পক্ষে ঝুঁকে ছিল।
সূত্র: বিবিসি

ট্যাগ:

ছয় মাসে ৭০০ নাগরিককে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী: জাতিসংঘ

প্রকাশ: ০১:১২:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গত বছরের নির্বাচনী সময়কালজুড়ে ৭শ’র বেশি বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে অন্তত ৭০২ জন নিহত হওয়ার তথ্য বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ শিশু রয়েছে।

প্রতিবেদনটি এমন এক সময়কালকে ঘিরে প্রকাশ করা হয়েছে, যখন সামরিক সরকার নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়। তবে প্রধান বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়ায় এ নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে প্রহসন হিসেবে আখ্যায়িত করে অনেকে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটির লাখো মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে গেছে।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এখনও দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর বিমান হামলাই ছিল ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় কারণ। দেশটির সাগাইং অঞ্চলকে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে অন্তত ১৯১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬০ জন নারী ও ৩০ শিশু।

গত অক্টোবরে সাগাইংয়ের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্কুলের সামনে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর গোলাবর্ষণের ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হন। নিহতদের মধ্যে চার শিশু ছিল। এছাড়া ডিসেম্বর মাসে সাগাইংয়ের তাবায়িন এলাকায় একটি চায়ের দোকানে বিমান হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত এবং আরও ২০ জন আহত হন। হামলার সময় সেখানে লোকজন ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য জড়ো হয়েছিলেন।

প্রতিবেদনটিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, তারা আরাকান আর্মির জোরপূর্বক নিয়োগ, হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেফতার এবং যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, ‘মিয়ানমারের জনগণ সামরিক বাহিনীর হাতে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার। এখন মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাদের ভুলে যেতে বসেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ের সুরক্ষা কার্যক্রমে অর্থায়ন অনেক মানুষের জন্য একমাত্র ভরসা ছিল। কিন্তু সেই সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের দুর্দশা আরও গভীর হচ্ছে।’

২০২১ সালে সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে এবং দেশটির তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি’কে কারাবন্দি করে। পরবর্তীতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো কিছু এলাকায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলেও সাম্প্রতিক বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী আবারও বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা জেনারেল মিন অং হ্লাইং দেশটির প্রেসিডেন্ট হন। তবে বিরোধী দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের বড় অংশ নির্বাচনের বাইরে থাকায় নির্বাচনটি আগে থেকেই একতরফা বলে বিবেচিত হচ্ছিল। সংসদে সামরিকপন্থি সদস্যদের প্রাধান্য রয়েছে এবং সংবিধান অনুযায়ী এক-চতুর্থাংশ আসন সরাসরি সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। বাকি আসনের মধ্যে সামরিক সমর্থিত ইউএসডিপি প্রায় ৮০ শতাংশ আসন জয় করেছে। সমালোচকদের মতে, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই সামরিক সরকারের পক্ষে ঝুঁকে ছিল।
সূত্র: বিবিসি