০৩:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ময়মনসিংহের দুর্দশা

মন্থর শহরকে সচল করার স্বপ্ন

ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে চড়পাড়ায় দীর্ঘ যানজট। ছবিসূত্র: গুগল সার্চ

পরিকল্পনাবিদ ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: ব্রহ্মপুত্র পাড়ের প্রাচীন জনপদ এবং বাংলাদেশের অন্যতম শিক্ষা নগরী হিসেবে সমাদৃত ময়মনসিংহ আজ এক অদ্ভুত অস্তিত্বের সংকটে নিমজ্জিত। যে শহরটি একদা শান্ত পরিবেশ আর ধীরলয়ের জীবনের জন্য পরিচিত ছিল, আজ তা বিশ্বের নবম মন্থরতম শহরের তকমা পেয়েছে। এই বাস্তবতা কেবল ভাগ্যের পরিহাস নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে চলা দুর্নীতি, অদূরদর্শী পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের এক প্রামাণ্য দলিল। গবেষণার একটি পিলে চমকানো তথ্য, এই স্থবিরতা কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির এক বিশাল বাধা; কারণ যাতায়াতের গতি মাত্র ১.৩ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারলেও দেশের জিডিপি ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। অথচ ময়মনসিংহের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থা থেকে শুরু করে দূরপাল্লার যোগাযোগ, সবখানেই সিন্ডিকেট আর অব্যবস্থাপনার জয়জয়কার। এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের গতানুগতিক ফ্লাইওভার বা জোড়াতালির সড়ক সংস্কারের চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে একটি সাহসী এবং ভিশনারি মহাপরিকল্পনার দিকে তাকাতে হবে।

ময়মনসিংহ শহরের ট্রাফিক জ্যামের ব্যবচ্ছেদ করলে প্রথমেই যে সমস্যাটি দৃশ্যমান হয়, তা হলো রাস্তার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা আকাশচুম্বী ভবনগুলোর জঙ্গল। বিগত সিটি প্রশাসনের আমলে বিল্ডিং কোড বা নূন্যতম সেটব্যাক নিয়মের তোয়াক্কা না করে এবং ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে ১০ থেকে ২০ তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে অবাধে। গুলকীবাড়ি, গাঙ্গিনারপাড়, আকুয়া, কাঁচিঝুলি কিংবা চরপাড়ার মতো এলাকাগুলোতে গেলে দেখা যায়, পুরনো সরু রাস্তার একদম ধার ঘেঁষে দানবীয় সব অট্টালিকা দাঁড়িয়ে আছে। এই ভবনগুলোর কারণে রাস্তা প্রশস্ত করার নূন্যতম কোনো ভৌগোলিক সুযোগ অবশিষ্ট নেই। উন্নয়নের নামে প্রভাবশালী চক্র যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মহোৎসব চালিয়েছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নগরবাসীকে। সরু রাস্তায় যখন অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নামে, তখন পুরো শহর এক স্থবির কারাগারে পরিণত হয়। এই অটোরিকশা খাতটিও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের দখলে। লাইসেন্স বাণিজ্য, ৭-৮ হাজার নিবন্ধিত যানের বিপরীতে প্রায় ৩০ হাজার অবৈধ যানের দৈনন্দিন দাপট, আর দৈনিক তোলা চাঁদার ভাগ যখন রাঘববোয়ালদের পকেটে যায়, তখন বিশৃঙ্খলা দমনের চেয়ে তা জিইয়ে রাখাই যেন এস্টাবলিশমেন্টের মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়।

এই স্থবিরতার প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে শহরের প্রধান ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে। গাঙ্গিনারপাড় ও সি.কে ঘোষ রোডের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো এখন বহুতল ভবন, হকার ও অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে, যেখানে যানের গতি মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কম। চরপাড়া মোড় ও মেডিকেল গেট এলাকাটি এখন যন্ত্রণার অন্য নাম; বিভাগীয় এই হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের নূন্যতম জায়গা না থাকায় মুমূর্ষু রোগীদের দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। পাটগুদাম ব্রিজ মোড় ও শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ এলাকাটি শহরের প্রবেশমুখ; অথচ ভোগান্তির প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আভ্যন্তরীণ যানের ধীরগতি ও অপরিকল্পিত বাস স্ট্যান্ড প্রতিদিনের ভোগান্তিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া নতুন বাজার লেভেল ক্রসিং, টাউন হল মোড়, জিলা স্কুল মোড় ও কালীবাড়ি এলাকার জটলা প্রমাণ করে যে, শহরের প্রতিটি ইঞ্চি অব্যবস্থাপনায় পিষ্ট।

ময়মনসিংহের বুক চিরে চলা রেললাইনটি নিয়ে প্রচলিত চিন্তা হলো এটিকে শহর থেকে বের করে নেওয়া। কিন্তু আধুনিক নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে এটি হতে পারে এক বিশাল আশীর্বাদ। শহরের কেন্দ্রস্থলে রেলস্টেশনের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত ওভারপাস, আন্ডারপাস বা এলিভেটেড রেললাইন নির্মাণ করলে জনভোগান্তি কমিয়ে যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। রেললাইন সরিয়ে নেওয়ার ‘সহজ’ সমাধানের পেছনে মূলত বিশাল জমি অধিগ্রহণ ও বাণিজ্যিক স্বার্থই বেশি দৃশ্যমান, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াতকে আরও কঠিন করে তুলবে। বরং এই কেন্দ্রীয় অবস্থানকে একটি মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবে রূপান্তর করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যে নীতিনির্ধারকেরা শহর থেকে রেললাইন সরানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেন, তারাই আবার শহরের যানজটের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ‘মার্কেট’ বিকেন্দ্রীকরণের সবচেয়ে বড় বিরোধী।

আক্ষেপের বিষয় হলো, যে কেওয়াটখালী আর্চ স্টিল ব্রিজটি ময়মনসিংহের মানুষের জন্য মুক্তির পথ হওয়ার কথা ছিল, সেটিও এখন প্রশ্নবিদ্ধ নকশার বেড়াজালে বন্দি। অভিযোগ উঠেছে যে, প্রভাবশালী দুটি আবাসন কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় একনেক অনুমোদিত মূল সোজা নকশা পরিবর্তন করে ২,৩০০ মিটার লম্বা একটি ‘ইউ’ আকৃতির বাঁকা সংযোগ সড়ক তৈরি করা হচ্ছে। এই বাঁকা সড়কটি যখন পুরনো শম্ভুগঞ্জ ব্রিজের ট্রাফিকের সাথে একই মোহনায় মিশবে, তখন সেখানে এমন এক ‘ডেডলক’ সৃষ্টি হবে যা বর্তমানের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের স্বার্থে জমি অধিগ্রহণ করায় প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২,০০০–৩,০০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্পষ্টতই জনগণের অর্থের অপচয়।

ময়মনসিংহ থেকে রাজধানীর দূরত্ব মাত্র ১১৮ কিলোমিটার, কিন্তু এই পথটুকু পাড়ি দিতে অনেক সময় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময়ও কুলায় না। এক সময়কার সুশৃঙ্খল ‘এনা পরিবহন’ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজ পতনের মুখে, আর এর বিকল্প হিসেবে যারা এসেছে, তাদের অব্যবস্থাপনা যাত্রী ভোগান্তিকে চরমে নিয়ে গেছে। এবারের ঈদেই ঢাকা-ময়মনসিংহ যাত্রা দশ ঘন্টা সময়ও নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ সময়ই বাস ছাড়তে ঘন্টার পর ঘন্টা দেরী করে। বাসভাড়া নিয়েও নেই কোনো সুনির্দিষ্ট চার্ট, কিংবা, থাকলেও সেটার সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই। এই রুটের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজেই গুরুতর যানজটের শিকার সাধারণ যাত্রীরা। মাসকান্দা বা ব্রিজ মোড় থেকে বাস ছাড়ার পরপরই ‘ঢাকা বাইপাস’ এলাকায় যাত্রী তোলার নাম করে বাসগুলো দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কৃত্রিম যানজট তৈরি করে। এরপর পর্যায়ক্রমে ত্রিশাল, ভালুকা, স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এবং মাওনা ফ্লাইওভার এবং চৌরাস্তার মতো পয়েন্টগুলোতে যে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, তাতে সুস্থ মানুষেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম।

কর্তৃপক্ষ সব জেনেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন এই রুটে যাতায়াত করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। এমতাবস্থায়, এই ভোগান্তি নিরসনে হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করে যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ করা, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রতিটি স্টপেজে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বাসের শিডিউল ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।

পাশাপাশি, দূরপাল্লার যাত্রায় ময়মনসিংহের বিদ্যমান অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের এখন ‘বুলেট ট্রেন’ বা হাই-স্পিড রেলের মতো ভিশনারি স্বপ্ন দেখতে হবে। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে পৌঁছাতে যদি মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট সময় লাগে, তবে এই শহরটি হবে ঢাকার প্রকৃত ‘স্যাটেলাইট সিটি’। এতে কেবল ভোগান্তিই কমবে না, বরং ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমবে এবং এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক অভাবনীয় বিপ্লব আসবে।

তবে সমন্বিত আধুনিক যাতায়াত পরিকাঠামোর পাশাপাশি আমাদের ফিরে তাকাতে হবে নৌপথের দিকে; আবহমান বাংলার মূল ভিত্তি ছিলো জনপদগুলোর মধ্যকার নৌসংযোগ, অথচ আমরা হাজার বছর ধরে চলে আসা এই রুটটি বাদ দিয়েই আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা পরিকল্পনা করছি, যা আদতে সর্বনাশ নিয়ে আসছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, প্রকৃতিকে কখনো বাধ্য করা যায়না। ব্রহ্মপুত্র খননের নামে শত শত কোটি টাকা খরচ হলেও নাব্যতা ফেরানো যায়নি, বরং বালু তোলার নামে লুটপাটের মহোৎসব চলেছে। যদি ঢাকা-ভৈরব-ময়মনসিংহ নৌপথটি পুনরায় সচল করা যায়, তবে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েকগুণ কমে আসবে এবং সড়কপথের ওপর চাপও হ্রাস পাবে।

সর্বোপরি, ময়মনসিংহকে বিশ্বের মন্থরতম শহরের গ্লানি থেকে মুক্ত করতে হলে এখন আর জোড়াতালির উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রয়োজন নীতিগত সততা এবং সাহসী মহাপরিকল্পনা। শহরের আভ্যন্তরীণ ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। যানজটের হটস্পটগুলোকে চিহ্নিত করে দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ময়মনসিংহের মতো সেকেন্ডারি শহরগুলোতে যেহেতু বুলেট ট্রেনের মতো প্রকল্প তাৎক্ষনিক হাতে নেয়া সম্ভবপর নয়, তাই, আপাত সমাধান হিসেবে অতি দ্রুত একটি স্বতন্ত্র বাস মনিটরিং অথরিটি প্রতিষ্ঠা পূর্বক দূরপাল্লার বেলাগাম যাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দিনের বেলায় শহরের ভেতরে সব রকমের ট্রাকগুলোর যাত্রা নিষিদ্ধ করতে হবে। সড়কে বাসের রেষারেষি এবং যত্রতত্র যাত্রী তোলা ও নামানো বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ই-টিকিটিং এবং আধুনিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলে ভাড়ার নৈরাজ্য দূর হবে। কোনো কোম্পানি নিয়ম ভঙ্গ করলে বা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে কেবল জরিমানা নয়, বরং প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের সকল বাসের রুট পারমিট বাতিলের মতো কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

এছাড়াও, বিল্ডিং কোড লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ পূর্বক অবৈধ ভবন গুড়িয়ে দিয়ে রাস্তা যতটুকু সম্ভব প্রশস্ত করা, কেওয়াটখালী ব্রিজের ত্রুটিপূর্ণ নকশা সংশোধন করা, লাইসেন্স বাণিজ্যের লাগাম ধরা, ব্রহ্মপুত্রের প্রকৃত নাব্য ফেরানো এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ বুলেট ট্রেনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, এই স্তম্ভগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ময়মনসিংহের ভবিষ্যৎ। আমাদের মনে রাখতে হবে, ময়মনসিংহের এই গতিহীনতা কেবল একটি শহরের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে গলা টিপে ধরার নামান্তর।

লেখক: সদস্য সচিব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), ময়মনসিংহ জেলা কমিটি।

ময়মনসিংহের দুর্দশা

মন্থর শহরকে সচল করার স্বপ্ন

প্রকাশ: ০২:০৬:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

পরিকল্পনাবিদ ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল: ব্রহ্মপুত্র পাড়ের প্রাচীন জনপদ এবং বাংলাদেশের অন্যতম শিক্ষা নগরী হিসেবে সমাদৃত ময়মনসিংহ আজ এক অদ্ভুত অস্তিত্বের সংকটে নিমজ্জিত। যে শহরটি একদা শান্ত পরিবেশ আর ধীরলয়ের জীবনের জন্য পরিচিত ছিল, আজ তা বিশ্বের নবম মন্থরতম শহরের তকমা পেয়েছে। এই বাস্তবতা কেবল ভাগ্যের পরিহাস নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে চলা দুর্নীতি, অদূরদর্শী পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের এক প্রামাণ্য দলিল। গবেষণার একটি পিলে চমকানো তথ্য, এই স্থবিরতা কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির এক বিশাল বাধা; কারণ যাতায়াতের গতি মাত্র ১.৩ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারলেও দেশের জিডিপি ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। অথচ ময়মনসিংহের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থা থেকে শুরু করে দূরপাল্লার যোগাযোগ, সবখানেই সিন্ডিকেট আর অব্যবস্থাপনার জয়জয়কার। এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের গতানুগতিক ফ্লাইওভার বা জোড়াতালির সড়ক সংস্কারের চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে একটি সাহসী এবং ভিশনারি মহাপরিকল্পনার দিকে তাকাতে হবে।

ময়মনসিংহ শহরের ট্রাফিক জ্যামের ব্যবচ্ছেদ করলে প্রথমেই যে সমস্যাটি দৃশ্যমান হয়, তা হলো রাস্তার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা আকাশচুম্বী ভবনগুলোর জঙ্গল। বিগত সিটি প্রশাসনের আমলে বিল্ডিং কোড বা নূন্যতম সেটব্যাক নিয়মের তোয়াক্কা না করে এবং ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে ১০ থেকে ২০ তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে অবাধে। গুলকীবাড়ি, গাঙ্গিনারপাড়, আকুয়া, কাঁচিঝুলি কিংবা চরপাড়ার মতো এলাকাগুলোতে গেলে দেখা যায়, পুরনো সরু রাস্তার একদম ধার ঘেঁষে দানবীয় সব অট্টালিকা দাঁড়িয়ে আছে। এই ভবনগুলোর কারণে রাস্তা প্রশস্ত করার নূন্যতম কোনো ভৌগোলিক সুযোগ অবশিষ্ট নেই। উন্নয়নের নামে প্রভাবশালী চক্র যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মহোৎসব চালিয়েছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নগরবাসীকে। সরু রাস্তায় যখন অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নামে, তখন পুরো শহর এক স্থবির কারাগারে পরিণত হয়। এই অটোরিকশা খাতটিও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের দখলে। লাইসেন্স বাণিজ্য, ৭-৮ হাজার নিবন্ধিত যানের বিপরীতে প্রায় ৩০ হাজার অবৈধ যানের দৈনন্দিন দাপট, আর দৈনিক তোলা চাঁদার ভাগ যখন রাঘববোয়ালদের পকেটে যায়, তখন বিশৃঙ্খলা দমনের চেয়ে তা জিইয়ে রাখাই যেন এস্টাবলিশমেন্টের মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়।

এই স্থবিরতার প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে শহরের প্রধান ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে। গাঙ্গিনারপাড় ও সি.কে ঘোষ রোডের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো এখন বহুতল ভবন, হকার ও অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে, যেখানে যানের গতি মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কম। চরপাড়া মোড় ও মেডিকেল গেট এলাকাটি এখন যন্ত্রণার অন্য নাম; বিভাগীয় এই হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের নূন্যতম জায়গা না থাকায় মুমূর্ষু রোগীদের দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। পাটগুদাম ব্রিজ মোড় ও শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ এলাকাটি শহরের প্রবেশমুখ; অথচ ভোগান্তির প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আভ্যন্তরীণ যানের ধীরগতি ও অপরিকল্পিত বাস স্ট্যান্ড প্রতিদিনের ভোগান্তিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া নতুন বাজার লেভেল ক্রসিং, টাউন হল মোড়, জিলা স্কুল মোড় ও কালীবাড়ি এলাকার জটলা প্রমাণ করে যে, শহরের প্রতিটি ইঞ্চি অব্যবস্থাপনায় পিষ্ট।

ময়মনসিংহের বুক চিরে চলা রেললাইনটি নিয়ে প্রচলিত চিন্তা হলো এটিকে শহর থেকে বের করে নেওয়া। কিন্তু আধুনিক নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে এটি হতে পারে এক বিশাল আশীর্বাদ। শহরের কেন্দ্রস্থলে রেলস্টেশনের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত ওভারপাস, আন্ডারপাস বা এলিভেটেড রেললাইন নির্মাণ করলে জনভোগান্তি কমিয়ে যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। রেললাইন সরিয়ে নেওয়ার ‘সহজ’ সমাধানের পেছনে মূলত বিশাল জমি অধিগ্রহণ ও বাণিজ্যিক স্বার্থই বেশি দৃশ্যমান, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াতকে আরও কঠিন করে তুলবে। বরং এই কেন্দ্রীয় অবস্থানকে একটি মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবে রূপান্তর করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যে নীতিনির্ধারকেরা শহর থেকে রেললাইন সরানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেন, তারাই আবার শহরের যানজটের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ‘মার্কেট’ বিকেন্দ্রীকরণের সবচেয়ে বড় বিরোধী।

আক্ষেপের বিষয় হলো, যে কেওয়াটখালী আর্চ স্টিল ব্রিজটি ময়মনসিংহের মানুষের জন্য মুক্তির পথ হওয়ার কথা ছিল, সেটিও এখন প্রশ্নবিদ্ধ নকশার বেড়াজালে বন্দি। অভিযোগ উঠেছে যে, প্রভাবশালী দুটি আবাসন কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় একনেক অনুমোদিত মূল সোজা নকশা পরিবর্তন করে ২,৩০০ মিটার লম্বা একটি ‘ইউ’ আকৃতির বাঁকা সংযোগ সড়ক তৈরি করা হচ্ছে। এই বাঁকা সড়কটি যখন পুরনো শম্ভুগঞ্জ ব্রিজের ট্রাফিকের সাথে একই মোহনায় মিশবে, তখন সেখানে এমন এক ‘ডেডলক’ সৃষ্টি হবে যা বর্তমানের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের স্বার্থে জমি অধিগ্রহণ করায় প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২,০০০–৩,০০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্পষ্টতই জনগণের অর্থের অপচয়।

ময়মনসিংহ থেকে রাজধানীর দূরত্ব মাত্র ১১৮ কিলোমিটার, কিন্তু এই পথটুকু পাড়ি দিতে অনেক সময় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময়ও কুলায় না। এক সময়কার সুশৃঙ্খল ‘এনা পরিবহন’ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজ পতনের মুখে, আর এর বিকল্প হিসেবে যারা এসেছে, তাদের অব্যবস্থাপনা যাত্রী ভোগান্তিকে চরমে নিয়ে গেছে। এবারের ঈদেই ঢাকা-ময়মনসিংহ যাত্রা দশ ঘন্টা সময়ও নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ সময়ই বাস ছাড়তে ঘন্টার পর ঘন্টা দেরী করে। বাসভাড়া নিয়েও নেই কোনো সুনির্দিষ্ট চার্ট, কিংবা, থাকলেও সেটার সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই। এই রুটের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজেই গুরুতর যানজটের শিকার সাধারণ যাত্রীরা। মাসকান্দা বা ব্রিজ মোড় থেকে বাস ছাড়ার পরপরই ‘ঢাকা বাইপাস’ এলাকায় যাত্রী তোলার নাম করে বাসগুলো দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কৃত্রিম যানজট তৈরি করে। এরপর পর্যায়ক্রমে ত্রিশাল, ভালুকা, স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এবং মাওনা ফ্লাইওভার এবং চৌরাস্তার মতো পয়েন্টগুলোতে যে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, তাতে সুস্থ মানুষেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম।

কর্তৃপক্ষ সব জেনেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন এই রুটে যাতায়াত করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। এমতাবস্থায়, এই ভোগান্তি নিরসনে হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করে যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ করা, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রতিটি স্টপেজে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বাসের শিডিউল ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।

পাশাপাশি, দূরপাল্লার যাত্রায় ময়মনসিংহের বিদ্যমান অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের এখন ‘বুলেট ট্রেন’ বা হাই-স্পিড রেলের মতো ভিশনারি স্বপ্ন দেখতে হবে। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে পৌঁছাতে যদি মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট সময় লাগে, তবে এই শহরটি হবে ঢাকার প্রকৃত ‘স্যাটেলাইট সিটি’। এতে কেবল ভোগান্তিই কমবে না, বরং ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমবে এবং এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক অভাবনীয় বিপ্লব আসবে।

তবে সমন্বিত আধুনিক যাতায়াত পরিকাঠামোর পাশাপাশি আমাদের ফিরে তাকাতে হবে নৌপথের দিকে; আবহমান বাংলার মূল ভিত্তি ছিলো জনপদগুলোর মধ্যকার নৌসংযোগ, অথচ আমরা হাজার বছর ধরে চলে আসা এই রুটটি বাদ দিয়েই আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা পরিকল্পনা করছি, যা আদতে সর্বনাশ নিয়ে আসছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, প্রকৃতিকে কখনো বাধ্য করা যায়না। ব্রহ্মপুত্র খননের নামে শত শত কোটি টাকা খরচ হলেও নাব্যতা ফেরানো যায়নি, বরং বালু তোলার নামে লুটপাটের মহোৎসব চলেছে। যদি ঢাকা-ভৈরব-ময়মনসিংহ নৌপথটি পুনরায় সচল করা যায়, তবে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েকগুণ কমে আসবে এবং সড়কপথের ওপর চাপও হ্রাস পাবে।

সর্বোপরি, ময়মনসিংহকে বিশ্বের মন্থরতম শহরের গ্লানি থেকে মুক্ত করতে হলে এখন আর জোড়াতালির উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রয়োজন নীতিগত সততা এবং সাহসী মহাপরিকল্পনা। শহরের আভ্যন্তরীণ ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। যানজটের হটস্পটগুলোকে চিহ্নিত করে দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ময়মনসিংহের মতো সেকেন্ডারি শহরগুলোতে যেহেতু বুলেট ট্রেনের মতো প্রকল্প তাৎক্ষনিক হাতে নেয়া সম্ভবপর নয়, তাই, আপাত সমাধান হিসেবে অতি দ্রুত একটি স্বতন্ত্র বাস মনিটরিং অথরিটি প্রতিষ্ঠা পূর্বক দূরপাল্লার বেলাগাম যাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দিনের বেলায় শহরের ভেতরে সব রকমের ট্রাকগুলোর যাত্রা নিষিদ্ধ করতে হবে। সড়কে বাসের রেষারেষি এবং যত্রতত্র যাত্রী তোলা ও নামানো বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ই-টিকিটিং এবং আধুনিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলে ভাড়ার নৈরাজ্য দূর হবে। কোনো কোম্পানি নিয়ম ভঙ্গ করলে বা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে কেবল জরিমানা নয়, বরং প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের সকল বাসের রুট পারমিট বাতিলের মতো কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

এছাড়াও, বিল্ডিং কোড লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ পূর্বক অবৈধ ভবন গুড়িয়ে দিয়ে রাস্তা যতটুকু সম্ভব প্রশস্ত করা, কেওয়াটখালী ব্রিজের ত্রুটিপূর্ণ নকশা সংশোধন করা, লাইসেন্স বাণিজ্যের লাগাম ধরা, ব্রহ্মপুত্রের প্রকৃত নাব্য ফেরানো এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ বুলেট ট্রেনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, এই স্তম্ভগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ময়মনসিংহের ভবিষ্যৎ। আমাদের মনে রাখতে হবে, ময়মনসিংহের এই গতিহীনতা কেবল একটি শহরের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে গলা টিপে ধরার নামান্তর।

লেখক: সদস্য সচিব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), ময়মনসিংহ জেলা কমিটি।